মুক্তিযোদ্ধা- তখন এখন
(তথ্যসূত্র- সিডাটিভ হিপনোটিক্স, লাইটার ফেসবুক পোস্টস)
মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সফর আলী
কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের মনসুর গ্রামের বাসিন্দা। একাত্তরে কোরমা বাগানে ৩৬টি হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে টানা সাতদিন ব্লক করে রেখেছিলেন পাকিস্তানী সৈন্যদের। স্বাধীন দেশে ফিরে দেখলেন, নিঃস্ব এক মানুষ তিনি। ঘোর নেই, বাড়ি নেই, কিচ্ছু নেই। তবে সেই দেশটা আছে। কিন্তু সেই দেশে নিজেকে আর কোথাও খুঁজে পান না সফর আলী। আমরা খুঁজে পেলাম। দীর্ঘদিন রিকশা চালিয়ে বেঁচে থাকা সেই মানুষটা স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এসে সুদীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তার কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে স্বদেশের বাতাস। হাতের ইনফেকশনে মৃতপ্রায় এক পরাজিত সৈনিক! কিন্তু পরাজয় এতো সহজ!! সেই রুদ্র প্রাণের মুক্তিযোদ্ধার?
মুক্তিযোদ্ধা অজিত রঞ্জন আচার্য্য
কুলাউড়া উপজেলার মনরাজ গ্রামের বাসিন্দা। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন তিনি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চলে গিয়েছিলেন ভারতের কৈলাশশহরের রিফিউজি ক্যাম্পে। সেখানে প্রায় তিন মাস থাকার পর আর মন টিকছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার যুদ্ধ চলছে, আর তিনি কী করে পালিয়ে থাকবেন! চলে গেলেন লোহারবনের ট্রেনিং ক্যাম্পে। প্রায় দুই মাস ট্রেনিং নেয়ার পর তাঁদের গ্রুপকে লাঠিটিলায় গেরিলা হামলার জন্য পাঠানো হলো। রাতের আঁধারে হামলা চালিয়ে আবার রাতের মধ্যেই ভারতের ট্রেনিং ক্যাম্পে ফিরে যেতেন। এভাবেই করলেন যুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও সেই নিঃস্ব মানুষের গল্প! সেই গল্পের সবটা জুড়ে তীব্র উপহাস! স্বাধীনতার ৪৩ বছরে এসে ঘর নেই তার! অথচ কি নির্লজ্জ স্পর্ধায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি এই মাটিতে! কি ভয়াবহ নির্লজ্জ স্পর্ধায়!!
তাঁর শেষ ইচ্ছা হলো মারা যাওয়ার আগে পরিবারের জন্য একটা টিনশেডের ঘর বানিয়ে দিয়ে যাওয়া। সারাজীবন দারিদ্র্যতার সঙ্গে লড়ে আসার পর একজন মুক্তিযোদ্ধার কতো সামান্য এক চাওয়া, 'আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন একটু ভালো বাসাতে থাকে!'
মুক্তিযোদ্ধা নিমাই রায়
পেশায় চা শ্রমিক। এখনো, তখনো! ১৯৭১ সালে ষোল বছর বয়সে যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিতে চলে গিয়েছিলেন যুদ্ধে। যুদ্ধ করেছিলেন চার নং সেক্টরের কাশিনগর, লোহাউনি বাগান ও শমশেরনগরে। বয়স এখন ষাট। অনেক স্মৃতিই ভুলে গেছেন। অথবা ভুলেন নি! আদতে কথা বলতেই ইচ্ছুক নন এই মানুষটা। তেতাল্লিশ বছর কেটেছে অনাদরে-অবহেলায়, শুনেছেন অসংখ্য আশ্বাসবাণী। কিন্তু সেগুলো শুধু ফাঁকা বুলিই থেকে গেছে! তাই রাগে-ক্ষোভে যুদ্ধের সময়ের কথাই স্মৃতিচারণ করতে চান না। তাঁর একটাই কথা, 'চা শ্রমিক ছিলাম। যুদ্ধের ডাক এসেছে, তাই দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গেছি। দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর আবার চা বাগানে কাজে যোগ দিয়েছি।' সাদাসিধে মানুষটার মনে কতটা কষ্টের বোবা আর্তনাদ, কতটা বিতৃষ্ণা তাঁর এই জীবনের প্রতি
মুক্তিযোদ্ধা দীপক চক্রবর্তী
কুলাউড়া উপজেলার লোহাউনি বাগানের বাসিন্দা। ১৯৭১ সালে ১৬ বছরের টগবগে তরুন, ক্লাস নাইনে পড়ছেন। একটা স্বাধীন দেশ, একটা পতাকার জন্য নিজ দায়িত্ববোধ থেকেই যুদ্ধে যোগদান করেন। বয়স কম থাকায় প্রথমে নিতে চাননি কমান্ডার। কিন্তু কমান্ডারের পায়ে ধরে সে কী অনেক কাকুতি মিনতি! পরে কমান্ডার বাধ্য হলেন তাঁকে সঙ্গে নিতে। প্রায় চার মাস ট্রেনিং দেয়ার পর পাগল হয়ে উঠলে, 'আমি যুদ্ধে যাব, যুদ্ধে!' এরপর যুদ্ধে গেলেন, দুঃসাহসী সব মিশনে অংশ নিলেন, হানাদারদের বিতাড়িত করতে গিয়ে গুলিও খেয়েছেন। তবু আজ তাঁকে চা বাগানে কাজ করতে হয়। রাত গভীর হলে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর দুশ্চিন্তায়, 'আমার কিছু হলে মেয়ের কি হবে, স্ত্রীর কি হবে!
মুক্তিযোদ্ধা শ্রী হরেন্দ্র দাস
১৯৭১ সাল, ১৯ বছরের হরেন্দ্র তখন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। ভারতের লোহারবনে ট্রেনিং নিয়ে প্রথমে কুকিরতলে, তারপর জুরিতে যুদ্ধ করেন। ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ঝটিকা হামলা চালিয়ে আবার ট্রেনিং ক্যাম্পে ফিরে যেতেন। এরকম কতবার যে গুপ্ত হামলা চালিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। দেশের ইজ্জত রক্ষার্থে যদি মারা যেতেন তাতেও তাঁর কোন আফসোস ছিলো না। তাঁর খারাপ লাগে শুধু একটি কারণে, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও কোন মুল্যায়ন পাননি। নিজে এখনো ঠেলা চালান, কারো বাড়ীতে গিয়ে কাজ করেন। এভাবেই চালাচ্ছেন নিজের পরিবার। সদা হাসি লেগে থাকে তাঁর মুখে। তাঁর সঙ্গে কথা না বলে শুধু দেখে ঠাউর করা কঠিন, কত না কষ্ট তাঁর বুকে জমাট বাধা! একটাই চাওয়া, তাঁকে একটি ঘর করে দেওয়া হোক। এখনো হাত-পা আছে, কিছু না কিছু করে খেতে পারবেন। কিন্তু আমৃত্যু চেষ্টা করলেও একটা টিনের বাড়ি যে করা হবে না তাঁর!


0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home