ক্র্যাক প্লাটুন
(সমস্ত তথ্য- উপাত্ত যা দেখছেন এখানে, সব "ডন মাইকেল করলিওনে"-র ফেসবুক পোস্টস থেকে নেয়া)
আজকালের আধুনিক প্রজন্মের হিরো জেমস বণ্ড, পিচ্চি ভাগনে প্রায়ই
বন্ডের গল্প করে। মামা, মাইরগুলা দেখছ? কি ট্যালেন্ট... এইরাম কমান্ডো
হইতে পারলে আর কি লাগে।
পুরা দুনিয়া সামনে দাঁড়ায়া গেলেও ঠেকানো যায় না মানুষটারে। আরিব্বাপ্রে...
পুরা দুনিয়া সামনে দাঁড়ায়া গেলেও ঠেকানো যায় না মানুষটারে। আরিব্বাপ্রে...
আমাদেরও একজন ছিল। পাকিস্তানী সেনাদের সাথে তুমুল যুদ্ধ
চলতেছে, নির্বিকারচিত্তে এক হাতে সিগারেট টানতে টানতে আরেকহাতে গুলি করতেছে
খালেদ, যুদ্ধক্ষেত্রের খুব সাধারন দৃশ্য ছিল এইটা। একজন সেক্টর কমান্ডার
নরমালি পিছনের তাবুতে বসে নিরাপদে যুদ্ধ পরিচালনা করে, খালেদ ছিল পুরাই
উল্টা... নিজের হাতে মেশিনগান চালাইতে না পারলে সেইটারে যুদ্ধ বলে নাকি?
আমাদের একটা কমান্ডোও ছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর
ইতিহাসে সবচেয়ে দুর্ধর্ষ কমান্ডো ছিল সে। কমান্ডো ট্রেনিং শেষে তার সার্টিফিকেটে
লেখা ছিল, “এই ব্যক্তি পৃথিবীর যে কোন দেশের, যে কোন সেনাবাহিনীর
সঙ্গে, যে কোন অবস্থায়, অনায়াসে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে
সক্ষম, যুদ্ধ করতে পারদর্শী”। দেখতে সেই হ্যান্ডসাম ছিল, পাকিস্তান আর্মির
কমান্ডো ট্রেনিং দিতে যখন গ্রাউন্ডে আসতো, পাকি অফিসারগুলো ফিসফিস করত, “লুক জেন্টলম্যান, দিস ইজ তাহের, আ লিজেন্ড ইন দ্য
হিস্ট্রি অভ কামান্ডো ট্রেনিং। ...আ ম্যান ক্যান নট বী আ তাহের। হী ইজ আ সুপার, এক্সেপশনাল'।" নতুন
ক্যাডেটদের পাকি অফিসাররা সাবধান করে দিত, ‘ইয়াংম্যান, বী আ্যওয়ার অভ তাহের।
হী ইজ আ ভলকানো, আ হানড্রেড পার্সেন্ট এক্সামপল, প্রফেশনাল। সো সেভ ইয়্যুর স্কীন'’
মানুষটা
ছিল ক্র্যাক, ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার তাহের সবগুলা যুদ্ধে অস্ত্র হাতে বাঘের
মত যুদ্ধ করছিল। সে কমান্ডার, বাহিনীর স্বার্থেই তার নিজেরে
কিছুটা নিরাপদ রাখা লাগে। সে এইসবের ধার ধারলে তো... কামালপুর যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়ংকর
যুদ্ধ হইতেছে, মর্টার শেল আর মেশিঙ্গানের অবিরাম ঠা ঠা শব্দে বজ্রনিনাদ চারপাশে।
হঠাৎ একটা গোলা এসে পড়ল তাহেরের সামনে। ধোঁয়া কেটে যাওয়ার পর দেখা গেল, কমান্ডারের একটা পা
থেঁতলে দুই ভাগ হয়ে গেছে, শার্টটা খুলে পেচায়া বাঁধার পরেও দরদর করে রক্ত বের হইতেছে। আর
এইদিকে অজ্ঞান হওয়ার বদলে পাগলের মত গর্জন করছে মানুষটা,, থরথর করে কাঁপতেছে আর
ধমক দিতেছে , "আমার কিচ্ছু হয় নাই, ফ্রন্টে ফিরা যাও তোমরা,, যুদ্ধ চালায়ে যাও ...
আমি মরব না, যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরা আসব তোমাদের কাছে... আমি যেন ফিরে এসে দেখি
কামালপুর দখল হয়ে গেছে আর ঢাকার রাস্তা পরিস্কার..."
কুলনেস
জিনিসটা, ক্র্যাক জিনিসটা দুই নাম্বার সেক্টরের যোদ্ধারা হাতে কলমে শিখত, শিক্ষক ছিল মেজর খালেদ
মোশাররফ। মার্চের ২৬ তারিখেই ৪ঠ বেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়া বিদ্রোহ করল মানুষটা, ঢাকায় যে তার বউ-বাচ্চা
আছে, তাদের মেরে ফেলতে পারে, একটাবার ভাইবাও দেখল না। পুরাই
তারছিঁড়া ছিল, ঢাকা থেকে ট্রেনিং নিতে আসা ১৮-২০ বছর বয়সের হাজার হাজার পোলাপানরে
সে আর ক্যাপ্টেন হায়দার মিলা গেরিলাযুদ্ধের ট্রেনিং দিছিল, বারুদ বানায়া দিছিল
একেবারে। একটুও ভয়-ডর ছিল না ওদের, জানের মায়া ছিল না, চোখের পলকে এসএমজি বাইর
কইরা ট্রেইনড পাকি আর্মিরে ব্রাশফায়ার করত পোলাগুলা, হিট অ্যান্ড রান শেষে
মিনিটের মধ্যে আবার সব ভদ্র। ২৩শে অক্টোবর কুমিল্লা অঞ্চলে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলতেছে, এক হাতে মেশিনগান আরেক
হাতে সিগারেট, ব্রাশফায়ার করতে করতে অর্ডারও দিতেছে , এমন সময় পাকিস্তানী
মর্টার শেল... অসংখ্য স্পিন্টার ঢুকল মাথায়, রক্তে ভেসে যাইতেছে চারপাশ, তৎক্ষণাৎ হাসপাতালে
নেওয়া হইল। এই অবস্থায় কেউ বাঁচতে পারে না, বাচা সম্ভব না। মেডিকেল সায়েন্সের
আশ্চর্যতম মিরাকেল হয়ে বেঁচে উঠলো খালেদ, মাথার ভিতর তখন পাকি মর্টারের
স্পিন্টার...
নভেম্বর
মাসটা একগাদা আফসোস আর আক্ষেপ নিয়ে আসে। যদি তাহের আরেকটু ধৈর্য ধরতো, যদি খালেদকে প্রতিপক্ষ
না বানায়ে একসাথে কাজ করত, যদি খালেদ আরেকটু কঠোর হইতে পারত, যদি মুজিব হত্যার সাথে
সংশ্লিষ্ট সবাইরে ৩ তারিখেই ফাঁসি দিয়ে দিত, যদি তাহের জিয়াকে মুক্ত না করত, যদি তাহের একজন
পাকিস্তানীকে বিশ্বাস না করত...
পহেলা নভেম্বর মেজর খালেদের জন্মদিন ছিল। ১৪ই নভেম্বর ছিল কর্নেল আবু
তাহেরের। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর খালেদ আর তাহেরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানটা জাতীয়ভাবে
পালনের কথা ছিল, নতুন প্রজন্মের অসংখ্য তরুন-যুবাদের আসার কথা ছিল।
অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে উঠে হয়তো তাহের বলত
দুই ভাগ হয়ে যাওয়া পা নিয়ে মিত্রবাহিনীর উদ্ধারকারী অফিসারকে হাসতে হাসতে বলা সেই
অসামান্য উক্তি, 'এরা কী যুদ্ধ করবে, এরা আমার মাথায়ই গুলি লাগাতে
পারেনি। বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই, এরা আটকাতে পারবে না, এদের এই ক্ষমতাই নাই।
খালেদ বলত কিছু তারছিঁড়া ছেলেপেলের কথা, “ আমি তাদের বলছিলাম
ঢাকার আশে পাশে বোমা ফাটায়ে আসতে, তারা ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভিতরেই
ফাটায়ে আসছে। দিজ আর অল ক্র্যাক পিপল” বলার সময় হয়তো খালেদের চোখ দুটো
চিকচিক করে উঠত, একটা আশ্চর্য গর্ব ফুটে উঠত চোখে... মাই বয়েজ...
চোখের সানগ্লাস, ঠোঁটে সিগারেট, হাতে স্টেনগান--
আধুনিক মডেলের একটা গাড়ি থেকে নেমেই মুহূর্তের মধ্যে নীরবে পজিশন নিল ওরা।
রাজপুত্রের মত চেহারা আর স্টাইলিশ বেশভূষা দেখে বোঝার উপায় নাই কি ভয়ংকর তারছিঁড়া
পোলাপান এরা, ঢাকা শহরটা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য একেবারে নরক বানায়ে
তুলছিল এই বাচ্চা ছেলেগুলো। তারছিঁড়া ক্র্যাক পোলাপান ছিল সব, অসামান্য
দুঃসাহসী সব কর্মকাণ্ড দেখে দুই নম্বরের সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফ
বললেন, দিজ আর অল
ক্র্যাক পিপল। তখন থেকেই এই ছোট্ট দলটার নাম ক্র্যাক প্লাটুন...
পাকিস্তান
সেনাবাহিনী তখন সাক্ষাৎ যমদূত, সারা দেশে লাখ লাখ নিরীহ মানুষকে বিনা কারনে অবলীলায় গুলি করে
মেরে ফেলতেছে ওরা। একটা পিঁপড়াকে যেমন বিনা কারনে ইচ্ছে হলেই টিপে মেরে ফেলি আমরা, বিন্দুমাত্র
অনুশোচনাও হয় না তাতে,ঠিক সেইভাবে পাকিস্তানী সেনারা ইচ্ছে হলেই যাকে-তাকে যখন তখন
গুলি করে , বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলতেছিল। আর তরুন কিংবা যুবকদের
গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যাইতেছিল অজানা গন্তব্যে, যারা যাইতেছিল, তারা আর ফিরে আসতেছিল না। ভয়ংকর আতংকে
জমে থাকতো ঢাকা শহরের মানুষগুলো, যেকোনো মুহূর্তে ঠা ঠা ঠা করে কিছু গুলি আসবে, একটু আগে যারা
বেঁচে ছিল, তারা হুট করে মারা যাবে, এর চেয়ে বড় যন্ত্রণা আর ভয়ংকর ঘটনা আর হতে পারে
না। বেশিরভাগ সময় তাদের উপর ভয়ংকর টর্চার করা হইত, অমানুষিক নির্যাতনের এক পর্যায়ে কেবল
নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য আত্মহত্যা করার চেষ্টা করত মানুষগুলো। কিন্তু তাদের
আত্মহত্যা করতে দিত না পাকি শুয়োরগুলো।
এইরকম তীব্র ভয় আর
আতংকের উপত্যাকায় হঠাৎ করেই কয়েকটা অসম দুঃসাহসী ছেলে রুখে দাঁড়াইল, পুরো ঢাকা শহরে
হিট অ্যান্ড রান পদ্ধতিতে একের পর এক ভয়ংকর গেরিলা আক্রমন চালাইতে লাগলো, পাকিস্তান
সেনাবাহিনীর অন্তরাত্মা কেঁপে গেল, শহরের প্রতিটা জায়গায় প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে
একের পর এক গ্রেনেড বিস্ফোরণে আর অ্যামবুশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী হতভম্ব হয়ে গেল।


0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home