Sunday, December 21, 2014

বীর মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার বেলায়েত- শালদা নদী যুদ্ধ

(ডন মাইকেল করলেওনে-র ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেয়া) 

দুই নম্বর সেক্টরটা মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ সেক্টর ছিল। অসামান্য মেধা , তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর অকুতোভয় সাহসের মিশেলে গড়া বেশ কিছু দুর্ধর্ষ মানুষ জড়ো হয়েছিল এই সেক্টরে। সুবেদার বেলায়েত সেই তুলনায় অতটা অসধারন ছিল না। হাসিখুশী সরল মানুষটা খুব বিশ্বস্ত ছিল, সবার সাথে খুব সহজেই মিশে যেতে পারতো। বাড়ি ছিল সন্দীপ, বউ আর ছেলেমেয়ের কথা প্রায়ই বলতো। সেই মানুষটা হঠাৎ একদিন এক রূপকথার জন্ম দিয়ে বসলো।
শালদা নদী অঞ্চলটা ছিল পাকিস্তানি সেনাদের জন্য মৃত্যুপুরী। ওদের তুলনায় আমাদের অস্ত্র ছিল যৎসামান্য, তাও অনেক পুরাতন, কিন্তু আমাদের যোদ্ধারা ছিল সব তারছিঁড়া, মৃত্যুকে থোরাই কেয়ার করতো। রোদ-বৃষ্টি-কাঁদা-ঘুরঘুটে আঁধার, কিছুই দমাতে পারত না ওদের। সেদিন সকালে চারটা কোম্পানি মিলে একসাথে অ্যাটাক করার কথা ছিল নদীর ওইপাড়ে, বড় বড় বাংকার খুঁড়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে যেখানে পাকিস্তানীরা। অ্যাটাক হল, জবাব এল যথারীতি প্রচণ্ড বেগে। একের পর এক মর্টার শেল পড়তেছে, সালদা নদীর কাছে সেঃ লেফট্যানেন্ট জামিলের চার্লি কোম্পানিতে যুদ্ধ করতে থাকা বেলায়েতের পাশে হঠাৎ ঢলে পড়ল তার এক বন্ধু, গুলিটা কপাল ভেদ করে পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে। মুহূর্তের জন্য বেলায়েত নিশ্চল পাথর হয়ে গেল। ন্যাংটোকালের প্রানপ্রিয় বন্ধুড় মৃতদেহ কোলে নিশ্চল বেলায়েতের পৃথিবীটা যেন থমকে গেল হঠাৎ ...
ওই এক মুহূর্তই, এরপর হঠাৎ করেই ফোরথ বেঙ্গল রেজিমেন্টের হেডকোয়াটারের ওয়াকিটকিটা ভয়ংকর ব্যস্ত হয়ে উঠলো। বেলায়েতের হাসিখুশি গলাটা কেমন যেন পাথরকঠিন শোনাইল, স্যার, নদীর ওইপারের সবকয়টা বাংকার উড়ায়া দিয়া আসি, পারমিশন দেন স্যার। বারবার একই অনুরোধ, একটাবার অনুমতি দেন স্যার। ক্যাপ্টেন গাফফার আগরতলায় যাবেন, জরুরি মিটিং, এর মধ্যে বেলায়েতের এই বিচিত্র আবেদন, নদীর ওই পাড়ে এত শক্তিশালী একটা স্টাব্লিশমেন্ট সে নাকি উড়ায়া দিয়া আসবে... কি অদ্ভুত কথা, শোনো তো...
হঠাৎ করেই গাফফারের বিরক্তিমাখা গলা শোনা গেল, ঠিক আছে, যাও। গুডলাক। কয়েকটা সেকেন্ড নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না বেলায়েত, স্যার পারমিশন দিয়ে দিছেন!! ঈদের চাঁদ দেখলেও সে এতটা খুশী হত কিনা সন্দেহ আছে। রিকয়েলেস রাইফেলটা তুলে একাই সামনে এগোল বেলায়েত, হঠাৎ তপ্ত বুলেটের ঠা ঠা বেরোবার শব্দে চমকে উঠলো সবাই, কিছু বুঝে ওঠার আগেই উড়ে গেল ওপাশের সামনের দুইটা বাংকার।
তারপরের দুই ঘণ্টা যা হল, সেটা পাকিস্তানীরা তো দূরে থাক, বেলায়েতের সহযোদ্ধারা পর্যন্ত কল্পনা করতে পারেননি। পাকিস্তানীরা ভেবেছিল, প্রতিদিনের রুটিন গোলাগুলির অংশ এইটা, কিন্তু বেলায়েত ক্ষেপে যাওয়ায় সব হিসেব এলোমেলো হয়ে গেল। মাথার উপর দিয়ে সাই সাই করে ছুটে যাওয়া বুলেটের পরোয়া না করে বেলায়েতকে এইভাবে বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখে সহযোদ্ধারা নতুন উদ্যমে ফায়ার করতে শুরু করল। আচমকা এই ভয়ংকর তাণ্ডবে দিশেহারা হয়ে অস্ত্র তুলতে ভুলে গেল অনেক পাকি, পালাতে থাকলো দিগবিদিক। সেই দৃশ্য দেখে আরো উৎসাহে গুলি করতে করতেই নদী পার হল বেলায়েত আর অগ্রবর্তী বাহিনী, তারপর ভীমমূর্তিতে চার্জ করতে শুরু করল একের পর বাংকার প্রবল প্রতাপে।
গ্রীক পুরাণে হারকিউলিসের নাম হয়তো শুনে থাকবে পাকিস্তানীরা, অসম্ভব শক্তির সেই দেবতাকে দেখার ইচ্ছেটাও বোধহয় পূরণ হয়ে গেল তাদের সেদিন। মেজর ডাঃ আখতার সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্যটা বর্ণনা করেছেন এভাবে, দেখলাম, কণ্ঠ দিয়ে গর্জন বেরুচ্ছে, যেন একটা স্টিম রোলারের মত পাকিদের উপর দিয়ে চলে যাচ্ছে বেলায়েত, পিষতে পিষতে... লাঞ্চের আগেই সালদা নদী ষ্টেশনের শক্তিশালী ঘাঁটি দখলে চলে এল মুক্তিযোদ্ধাদের, কেবল প্রানটা হাতে নয়নপুরের দিকে পালিয়ে গেল পাকিস্তানীরা। বাংকারগুলোর ভেতর ঢুকে দেখা গেল, চুলার পাশে আঁটাগুলো গোল গোল করে পাকানো পড়ে আছে, চুলোর আগুন জ্বলছে তখনো, থরে থরে অস্ত্র আর গ্রেনেড সাজানো, কেবল জানটা হাতে নিয়ে পালিয়েছে ওরা, পেছনে ফিরে তাকাবার সাহস হয়নি, যারা মরেছে, তাদের নিষ্প্রাণ চোখে তখনো বিস্ময় লেগে আছে, কি অমিত তেজ, কি ভয়ংকর জলোচ্ছ্বাস...
সালদা নদী ষ্টেশন ঘাঁটিটা দখলের তিনদিনের মাথায় প্রবল যুদ্ধে শহীদ হন সুবেদার বেলায়েত। ফোরথ বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিনটা ব্যাটেলিয়ন, ভারতীয় মিডিয়াম আর্টিলারির এতো এতো সেনা মিলেও যে ঘাঁটি দখল করতে পারেনি, সুবেদার বেলায়েতের হারকিউলিসের মত অসমসাহসী বীরত্বে সেই ঘাঁটি দখল হয়েছিল মাত্র দুই ঘণ্টায়। পাকিস্তানীদের ভয়ংকর ক্ষোভ ছিল ওর উপর, তাই তিনদিনের মাথায় নয়নপুর ঘাঁটি থেকে চালানো হামলায় প্রায়োরিটি ছিল বেলায়েত হত্যা। লড়তে লড়তে শহীদ হয়েছিল বেলায়েত, বুকটা ভেসে গিয়েছিল তাজা রক্তে, কিন্তু ঠোঁটে লেগে ছিল সেই অকৃত্রিম হাসিটুকু... বেলায়েত হাসতে হাসতে প্রান দিয়েছিল, আমাদের বেলায়েত, যার বীরত্বের কাছে হারকিউলিসও কিছু না... কিচ্ছু না...

Sunday, December 14, 2014

অপারেশন মোনায়েম খাঁ কিলিং

(http://dokkhobilas90.blogspot.com/2013/03/blog-post_7870.html)

এক। তার সঙ্গে আমার পরিচয় বছর সাতেক আগে দৈনিক যুগান্তরে কাজ করার সময়। তখন বন্যায় ঢাকার নিম্নাঞ্চল ডুবতে শুরু করেছে। মোজাম্মেল হক, বীর প্রতীক (৫০) আবার ঢাকার উপকণ্ঠ ভাটারা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান। তো বন্যা দুর্গত আর ও ত্রাণ তৎপরতা নিয়ে তিনি তখন খুব ব্যস্ত। কালো রঙের একটি সেড তোলা টুপি পড়ে দিনরাত মোটর সাইকেল দাবড়ে বেড়াচ্ছেন।

আমি মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসী ভূমিকার কথা আগেই জেনেছিলাম পত্রিকা পড়ে। সে সময় তাঁর ব্যস্ততার কারণে অবশ্য এ নিয়ে কথা হয়নি। তবু পেশাগত সম্পর্কের বাইরে এক ধরনের শ্রদ্ধাপূর্ণ বন্ধুত্ব হয়। মানুষ হিসেবে তিনি খুব স্পষ্টবাদী, কাউকে তোয়াক্কা করা তার ধাঁতে নেই।

সে সময় একগাদা সাংবাদিকের সামনে এক দুপুরে চরম বিরক্তির সঙ্গে তিনি বলেই ফেললেন, “খোকা ভাই (মেয়র সাদেক হোসেন খোকা) আসবেন বিকালে। এর আগে ত্রাণ দিতে উনি নিষেধ করেছেন। মেয়র হিসেবে উনি ত্রাণ কাজের উদ্বোধন করতে চান! আরে মিয়া, সেই সকাল থেকে বন্যার্তরা এক হাতা খিচুড়ি খাওয়ার জন্য রোদের মধ্যে বসে আছে। খিদা কি আর এই সব মেয়র - ফেয়র, আর টিভি ক্যামেরা বোঝে? ত্রাণ লাগাও, ত্রাণ লাগাও। মেয়র আসলে তখন দেখা যাবে!”

তার নির্দেশে তখনই খিচুড়ি বিতরণ শুরু হয়ে যায়।

স্থানীয় বিএনপি নেতারা আর পুলিশ কর্মকর্তারা কী যেনো তাকে বোঝাতে চান, মাইকের শব্দে ভাল করে বোঝা যায় না। মোজাম্মেল ভাই শুধু মাথা নাড়েন। মাছি তাড়ানোর মতো বার দুয়েক হাত নাড়েন নেতা আর পুলিশ কর্তাদের উদ্দেশে।

জনপ্রিয় এই মানুষের সঙ্গে ঘন্টা তিনেক আলাপচারিতা হয় ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে। বিষয় -- মহান মুক্তিযুদ্ধ। প্রিয় পাঠক, আসুন তারই বয়ানে শুনি, ১৯৭১ এর সেই আগুন ঝরা দিনগুলোর কথা। শুনি, কিশোর মুক্তিযোদ্ধার সেই দুর্ধর্ষ 'অপারেশন মোনায়েম খান কিলিং'এর কথা।...

“১৯৭১ সালে আমি শাহীনবাগের স্টাফ ওয়েল ফেয়ার হাই স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র। বয়স মাত্র ১৪ বছর। বাড্ডা, ভাটারা, ছোলমাইদ তখন পুরোপুরি গ্রাম। মাইলের পর মাইল ধানের ক্ষেত, খাল - বিল - জলায় বিস্তৃর্ণ এলাকা। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টও তখন খুব কাছে মনে হয়। পাকিস্তানী সেনারা প্রায়ই আমাদের গ্রামের আশেপাশের মাঠে প্রশিক্ষণ নিতো।...আমার বাপ - চাচারা সবাই কৃষক, নিরক্ষর মানুষ। আমরা স্কুলে পড়ি। পড়ার ফাঁকে তাদের কৃষিতে সাহায্য করি, গরু চড়াই।”

“২৫ মার্চের রাতে বাবা ধানী জমিতে সেচ দিচ্ছিলেন। আমি গিয়েছি তাঁর জন্য খাবার নিয়ে। হঠাৎ ক্যান্টনমেন্ট থেকে গুলির শব্দ। মর্টারের ফায়ার আর ফ্লেয়ার গানের আলোয় পুরো আকাশ মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠে।... বাবা বললেন, যুদ্ধ শুরু হয়েছে। তাড়াতাড়ি বাড়ি চল।”

আমি তাকে জিগেষ করি, “আপনি ওই বয়সে যুদ্ধে গেলেন কোন চেতনা থেকে?”

তিনি বলেন, “তখন ওই বয়েসেই ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের পাক সেনাদের অত্যাচারের বেশ কিছু কথা আমরা শুনেছিলাম। গ্যারিসন সিনেমা হলে স্ত্রীকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন আমাদের গ্রামের এক লোক। পাক সেনারা তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে তার স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে। এছাড়া আমাদের গ্রামের পাশে প্রশিক্ষণ নিতে এসে তারা সদ্য প্রসূতি আরেক গৃহবধূকেও গণধর্ষণ করে।”


“আমরা বাসে চড়লে অবাঙালী কন্ডাক্টর - হেল্পাররা আমাদের সিট থেকে তুলে দিয়ে বিহারীদের সেই সিটে বসতে দিতো। তাছাড়া সে সময়ের ছাত্রলীগ নেতা, বিকমের ছাত্র আনোয়র হোসেন (বীর প্রতীক) ভাই আমাদের বলতেন, পূর্ব পাকিস্তানে কাগজের কল হওয়া সত্বেও এখানে কাগজের দিস্তা যখন ১৪ আনা, তখন পশ্চিম পাকিস্তানে কাগজের দাম ছিলো ৬ আনা। বাবার কাছে শুনেছিলাম, ১৯৬১ - ৬২ তে পাকিস্তান সরকার আমাদের তিন একর জমি অধিগ্রহণ করে মাত্র দেড় হাজার টাকা দাম দিয়েছিল।”

“আনোয়ার ভাই বলতেন, দেশ স্বাধীন করে বাঙালিদের নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে এই সব অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না। ২৫ মার্চের পর রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবরে শুনতাম পাক সেনাদের বর্বরতার কাহিনী। শুনতাম মুক্তি বাহিনীর অগ্রযাত্রার খবর। এ সবই আমাদের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে।”

মোজাম্মেল হক বলে চলেন, “আমি অন্য তিন চাচাতো ভাই আজাহারুল ইসলাম বকুল, গিয়াস উদ্দিন ও আবু সাঈদের সঙ্গে পরামর্শ করলাম, এক রাতে রহিমুদ্দীন ও আনোয়ার ভাইয়ের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে কুমিল্লা বর্ডার দিয়ে ত্রিপুরা যাবো। সেখানে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করবো। কিন্তু পরিকল্পনা বাড়িতে আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ায় আমি, বকুল আর সাঈদ পালাতে পারিনি। অন্য ঠিকই ত্রিপুরা চলে গিয়েছিলো।”

“এদিকে আমার মন মানে না। স্বাধীন বাংলা বেতারের খবর শুনি, দেশের জন্য আমার প্রাণ কাঁদে। মনে হয়, সব তরুণ - যুবারা যুদ্ধ করছে, আর আমরা মায়ের আঁচলের ছায়ায় আরাম - আয়াশে আছি। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। ১০ - ১৫ দিন বাড়িতে বসে থাকার পর আমি আর সাঈদ আবার যুক্তি করলাম, বাড়ি থেকে পালাবো, যুদ্ধে যাবো। এবার বাবা - মাকে বললাম, যদি টাকা - পয়সা দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি না দাও, তাহলে টাকা - পয়সা ছাড়াই বাড়ি থেকে পালাবো। তখন বাপ - চাচারা পরামর্শ করে টাকা - পয়সা দিয়ে আমাদের যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দেন।”

“তাহলে শেষ পর্য়ন্ত বাড়ির সম্মতিতে যুদ্ধে যান?”

“হ্যাঁ, আমি আর সাঈদ কিছু টাকা জুতোর ভেতর আলাদা করে লুকিয়ে, জামা - কাপড় গুছিয়ে এক রাতে রওনা হই। নরসিংদী পর্যন্ত বাসে, তারপর লঞ্চে কমিল্লার নবীনগর। শুনেছিলাম, কুমিল্লার সিএনবি রোড পার হলেই ত্রিপুরার বর্ডার। পথে পথে শত শত মানুষের দেখা পাই, যারা পরিবার - পরিজন নিয়ে দলে দলে শারণার্থী হিসেবে ভারত যাচ্ছেন। কেউ বা আবার যাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। কুমিল্লা পৌঁছে আমরা একটি রিকশা ভাড়া নেই সিএনবি রোড যাবো বলে।”

“কিন্তু রিকশা ওয়ালা আমাদের ঘুর পথে নিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যা করে ফেলে। তখন আমরা রিকশা ছেড়ে দিয়ে হাঁটা শুরু করি। পথ - ঘাট কিছুই চিনি না। এক লোক আমাদের এসে বলে, আপনারা আমার বাসায় চলেন, রাতটা কাটান, ভোরে আমরাই আপনাদের বর্ডার পার করে দেবো। আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক।”

“উপায় না দেখে আমরা সেই রাতে ওই লোকের বাসায় উঠি। রাতে খাবারের জন্য একটা মোরগ কিনবে বলে সেই লোক আমাদের কাছ থেকে টাকা চেয়ে নেয়। সারারাত বর্ডারে মর্টার বিনিময়ের শব্দ শুনি। গোলাগুলি বন্ধ হলে ভোরের দিকে দুজন লোক আমাদের সিএনবি রোডে নিয়ে যায়। তারা গোমতি নদী দেখিয়ে বলে, ওই পারে ইন্ডিয়া। লোক দুজন আমাদের পকেট হাতড়ে টাকা - পয়সা সব রেখে দেয়। জুতার ভেতরে লুকানো সামান্য কিছু টাকা তখন আমাদের শেষ সম্বল।”

“লুঙ্গী পরে ছোট্ট গোমতি নদী হেঁটে পার হই। ত্রিপুরা সীমান্তের উঁচু পাহাড় দেখা যায়।”


আমি বলি, “তাহলে, সীমান্ত পার হয়ে ট্রেনিং নিলেন। আর যুদ্ধ শুরু হলো?”

“আরে নারে ভাই, অত সহজে হয় নাই। প্রথমবার ভয়ে পালিয়ে এসেছি। ওপারে গিয়ে কোনাবন হয়ে কলেজটিলা ট্রিনিং ক্যাম্পে পৌঁছাই। সেখানে ক্যাম্প চিফ ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা রশিদ ভাই। সেখানে আমাদের ১৫ দিন রাখা হয়। থাকা - খাওয়ার অবস্থা আর বলতে! খাবার বলতে শুধু ডাল আর ভাত। আর ডাল যে দুর্গন্ধ হতে পারে, তা বলার নয়। আমরা রশিদ ভাইকে অতিষ্ট করে মারি, ভাই, আমাদের ট্রেনিং এ পাঠাবেন না?”

“তিনি আমাদের পাঠালেন পাশের নির্ভয়পুর ট্রেনিং ক্যাম্পে। সেখানে পৌঁছে দেখি, ক্যাম্পের নামই শুধু নির্ভয়পুর, আসলে নবাগতদের ভয় পাওয়ানোর মতো সব রকম ব্যবস্থাই সেখানে আছে। ট্রেনিং নিতে আসা মুক্তিযোদ্ধাদের সবার ‘চোখ উঠেছে’। জ্বর আর ডায়রিয়ায় একেকজনের অবস্থা কাহিল। পরিস্থিতি দেখে নামধাম রেজিস্ট্রি করার আগেই আমার চাচাতা ভাই বেঁকে বসে। সে আমাকে বলে, ‘চল, আমরা পালিয়ে দেশে ফিরে যাই। এখানে ট্রেনিং নিতে গেলে আর বাঁচতে হবে না। যুদ্ধের আগেই অসুখে এখানেই আমাদের মরতে হবে!’...তার কথা শুনে আমি সত্যি সত্যি ভয় পাই। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমরা চোরের মতো পালিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আবার গ্রামে ফিরে আসি।”...

দুই। “রোগ - শোকের ভয়ে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং না নিয়েই ত্রিপুরা থেকে দুই ভাই পালালেন, দেশে গ্রামের বাড়িতে ফিরলেন। তারপর?” আমি তাকে জিজ্ঞেস করি। মোজাম্মেল হক একটু স্থির হয়ে দম নেন। তারপর স্মৃতি হাতড়ে বলতে শুরু করেন আবার।

“তো ঢাকার গ্রামের বাড়ি ভাটারায় ফিরে সবার কাছে সত্যি কথাটাই বললাম। বাড়ির লোকজন তো মহাখুশী, যাক, ঘরের ছেলে ভালোয় ভোলোয় ঘরে ফিরেছে। ওই সব যুদ্ধের ভুত পালিয়েছে।”

“তখন রহিমুদ্দীন মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে গ্রামে ফিরে আসে। সে আমাকে বলে, ইন্ডিয়ায় যে গেরিলা ট্রেনিং নিয়েছি! আর হাতিয়ার আমাদের দিয়েছে! বুঝলি, তোদের মতো ভীতুদের আর দরকার নেই। এবার আমরাই দেশ স্বাধীন করে ফেলবো।”

“রহিমুদ্দীনের কথাটা আমার খুব মনের ভেতরে গিয়ে লাগে। ১০ - ১৫ দিন খুব অস্থিরতার মধ্যে কাটে। একদিন তাঁকে আবার ধরি, রহিম ভাই, আমি ভুল করেছি, তুমি আমাকে ট্রেনিং এ পাঠাও। আমি যুদ্ধে যাবো। সে কিছুতেই রাজী হয় না। শেষে আমাকে বলে, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার আগে তোমাকে সাহসিকতার পরীক্ষায় পাস করতে হবে। পাস করলে তারপর দেখা যাবে।”

“আমি রাজী হলে, জুন - জুলাই মাসে রহিমুদ্দীন এক সন্ধ্যায় আমাকে একটি হ্যান্ড গ্রেনেড দেয়। এর ব্যবহার শিখিয়ে দিয়ে বলে, এই বোমার ৩৬ টি টুকরো আছে। এটি ফাটলে ৩০ গজের মধ্যে যারা আছে, তারা সবাই মারা যাবে। তোমাকে এটি বিদেশীদের মার্কেটে মারতে হবে। পারলে সাহসিকতার পরীক্ষায় পাস।”


“পরে গ্রেনেডটিকে আমি প্যান্টের পকেটে নিয়ে রহিমুদ্দীনসহ গুলশান ২ নম্বর ব্রিজের পাকিস্তানী চেক পোস্ট সহজেই পার হয়ে যাই। সেখানে পাক সৈন্যদের সহায়তা করতো যে বাঙালি, সে আমাদের গ্রামেরই এক লোক। তাছাড়া ছাত্র হিসেবে আমার পরিচয়পত্র ছিলো। আমার অসুবিধা হয় না।”

“দুজনে একটা বেবী ট্যাক্সি নিয়ে গুলশান ১ নম্বর ডিআইটি মার্কেটে যাই। সেখানে বিদেশীদের আনাগোনা। রহিমুদ্দীন ‘রেকি’ করে বলে, এখানে সুবিধা হবে না, প্রচুর মিলিটারির পাহারা।”

“আমরা দুজনে একটি আরেকটি বেবী ট্যাক্সি নিয়ে মহাখালি টিবি হাসপাতাল গেটের দিকে যেতে থাকি। পথে বিদেশী পতাকা ওড়ানো একটি বাসা দেখি। ট্যাক্সি ঘুরিয়ে আবারো ওই পথে যাওয়ার সময় রহিমুদ্দীন আমাকে ইশারা করে। আমি চলন্ত বেবী ট্যাক্সি থেকে গ্রেনেডটির পিন খুলে ওই বাড়ির ভেতর ছুঁড়ে মারি।”...

“কিছুদূর যাওয়ার পরেই বিকট শব্দে গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত হয়। অবাঙালি বেবী চালক ব্রেক কষে আমাদের বলে, কেয়াঁ হুয়া হ্যায়? রহিমুদ্দীন তাকে ধমকে বলে, বোমা ফুটায়া! সালে লোগ, চালাও বেবী!”

“কিছুদূর গিয়ে আমরা বেবী ছেড়ে দিয়ে ঘুর পথে বাড্ডায় এক আত্নীয়র বাসায় ওই রাতটি কাটাই। পরদিন পত্রিকায় দেখি, বড় বড় হেড লাইনে খবর -- দুস্কৃতিকারীরা বিদেশী দূতাবাসে গ্রেনেড হামলা করেছে! সেটি কোন দূতাবাস ছিল, এখন আর মনে নেই।”...

“তারপর?” বালক - বিস্ময়ে আমি জানতে চাই।

মোজাম্মেল ভাই বলেন, “আর কী! রহিমুদ্দীনের পরীক্ষায় পাস। একদিন রাতে বাড়িতে ফিরে দেখি মা কাঁঠালের পিঠা বানিয়েছেন। সেই পিঠা খেতে খেতে মাকে আমি বলি, মা, আমি কাল সকালেই ট্রেনিং নিতে ইন্ডিয়া যাবো। আমাকে কিছু টাকা দিতে পারো?”

“মা বলেন, তোর বাবা তো বাড়িতে নেই। আর আমার কাছে তো টাকা - পয়সা থাকে না। দেখি, তোর চাচীর কাছে কিছু পাওয়া যায় কী না।”

“মা টাকা ধার করতে চাচীর বাসায় গেছেন। একটু পরে চাচা এসে আমাকে ধমকানো শুরু করলেন, এই সব কী? দুদিন পর পর যুদ্ধ, যুদ্ধ করে বাসায় অশান্তি করা! একবার আমার ছেলেকে (চাচাতো ভাই সাঈদ। ওই যে অসুখ - বিসুখের ভয়ে আমরা দুজন ত্রিপুরা থেকে ট্রেনিং না নিয়েই পালালাম!) উস্কানী দিয়ে ইন্ডিয়ায় নিয়ে গেলি। ট্রেনিং না নিয়েই পালিয়ে এলি। এখন আবার ট্রেনিং এর যাওয়ার জন্য বায়না ধরা।... এবার যেতে হলে তুই একই যা। আমার ছেলেকে সঙ্গে নিবি না!”

“আমি বললাম, টাকা দাও, না দাও, এবার আমি যাবোই। একাই যাবো, মরতে হলে একাই মরবো। তোমার ছেলেকে এবার নেবো না।”

“তো পরদিন ভোরে মা’র ধার করা ২৪৬ টাকা নিয়ে আমি গুলশান ২ নম্বর বাস স্ট্যান্ডে যাই। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা রহিমুদ্দীন আগে থেকেই আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। দুজনে ইপিআরটিসির বাস ধরে ভাঙা পথে কুমিল্লা পৌঁছাই। আবার সেই গোমতি নদী পর হয়ে পৌঁছাই মেলাঘর ট্রেনিং সেন্টারে। সেখানে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দার আমাকে দেখেই রহিমুদ্দীনকে ধমক, কী সব পোলাপাইন নিয়ে এসেছো! এই সব দিয়ে কী যুদ্ধ করা যায়? রহিমুদ্দীন আমার পক্ষে ওকালতি করে বলে, স্যার, ও ছোট হলেও খুব সাহসী। ঢাকার বিদেশী দূতাবাসে হ্যান্ড গ্রেনেড চার্জ করেছে!”

“শুরু হলো ট্রেনিং? কী কী অস্ত্র চালানো শিখলেন?”

“হ্যাঁ, মেজর হায়দারের সম্মতিতে এইবার সত্যি সত্যি গেরিলা ট্রেনিং শুরু হলো মেলাঘরে। ২১ দিনের ট্রেনিং এ আমি লাইট মেশিন গান (এলএমজি), কয়েক ধরণের রাইফেল, স্টেন গান, প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, এন্টি ট্যাংক মাইন, ১৬ ইঞ্চি মাইন, ফসফরাস বোমা, গ্রেনেড থ্রোইং, অ্যামবুশ প্রশিক্ষণ নেই।”

“২১ দিন পর ১৫ জন নিয়ে আমাদের ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গেরিলা গ্র“প তৈরি হলো। এর গ্র“প কমান্ডার হলেন এমএন লতিফ। আর সেই রহিমুদ্দীনকে করা হলো ডেপুটি কমান্ডার।”

“একদিন মেজর ফেরদৌস, ক্যাপ্টেন আয়েন উদ্দীন ও আনোয়ার হোসেন (বীর প্রতীক) আমাদের একটু ভাল খাইয়ে - দাইয়ে রাতের বেলা বিদায় দিলেন। কিন্তু যাদের সীমান্ত রেকি করতে পাঠানো হয়েছিলো, তার ঠিক ভাবে ডিউটি না করেই ক্লিয়ারেন্স দেয়। আমরা ১৫ জন কুমিল্লার সিএনবি রোডে উঠতেই পাক সেনাদের অ্যামবুশের মুখে পড়লাম। তিন - চারটা ব্যাংকার থেকে শুরু হলো ক্রমাগত মেশিনগানের গুলি।”

“ওই রাতে এক পাট ক্ষেতে পালিয়ে পরদিন বুকে ভর দিয়ে একটু একটু করে আবার ইন্ডিয়ার মেলাঘরে পৌঁছাই। দেখি আমরা ১৫ জনই অক্ষত আছি। কিন্তু মেজর হায়দার এবার বেঁকে বসলেন, এদের মর‌্যাল ডাউন হয়ে গেছে। এদের দিয়ে আর যুদ্ধ হবে না! তিনি নির্দেশ দিলেন, আমাদের কোনো একটি গেরিলা ইউনিটে গোলা বারুদ বহনকারী হিসেবে যোগানদারের দায়িত্ব পালন করতে!”

মোজাম্মেল হক বলে চলেন, “এই কথায় সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এতো কষ্ট করে ট্রেনিং নিলাম, আর শেষে কী না যোগানদার! আমরা কী যুদ্ধ করবো না!”

“আমি বুদ্ধি করে প্রতিদিন রুটিন করে মেজর হায়দারের অফিসের সামনে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে লাগলাম। ১৫ - ২০ দিন পর উনি আমাকে ডেকে বললেন, এই তোর কী হয়েছে? প্রত্যেক দিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকিস কোনো? আমি বলি, স্যার আমাদের যুদ্ধে পাঠান। আমরা মরতে ভয় পাই না। মেজর সাহেব বলেন, তোদের দিয়ে তো যুদ্ধ হবে না। তোদের মর‌্যাল বলতে আর কিচ্ছু নেই। আমি নাছোড়বান্দা, না স্যার। আমরা পারবো। আমাদের একটা অপারেশন দিয়েই দেখুন না!”

“মেজর হায়দার বলেন, তুই কাউকে মারতে পরবি? কোনো চিন্তা না করেই বলি, স্যার, পাকিস্তানের স্পীকার আব্দুল জব্বার খানকে মারতে পারবো। মেজর সাহেব আমাকে একটা চড় মারেন। বলেন, বেয়াদব, জানিস, এটা কতো কঠিন কাজ? আচ্ছা, তুই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা পাক গভর্নর মোনায়েম খানকে মারতে পারবি?”
“এইবার আমি বলি, স্যার, এটা আমার জন্য অনেক সহজ। আমি তার বাসা চিনি। ছোট বেলায় তার বাসার ওখানে খেলতে গিয়েছি। আমার এক দূর সম্পর্কের জব্বার চাচা তার বাসার গোয়ালা।”

“মেজর হায়দার হেসে হুকুম দেন, গেট টেন, উল্লুক কা পাঁঠা।”

“সঙ্গে সঙ্গে আমি ১০ টা বুক ডন দিতে লেগে যাই। বুঝতে পারি, আমাকে মোনায়েম খান কিলিং অপারেশনের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে!”

“এবার আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করি, স্যার, যদি অপারেশন সাকসেস হয়, আমাকে কী পুরস্কার দেবেন?”

“তুইই বল, তুই কী চাস?”

“অপারেশন শেষে আমি আপনার কোমরের রিভলবারটা চাই!”

“গেট লস্ট! উল্লুক কা পাঁঠা!”

“...ক্যাম্পে ফিরে গ্র“পকে এই খবর বলি। কেউ বিশ্বাস করে না। একটু পরে অর্ডার আসে, আমাদের ঢাকায় অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে! খুশীতে সবাই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে।”

“এরপরেও সীমান্তের একটি ছোটখাট যুদ্ধে আমাদের সাহসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। আমরা ১৫ জনের গ্র“প নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে পৌঁছাই। সঙ্গে যার যার হাতিয়ার জামার নীচে আর ব্যাগের ভেতর লুকানো।”

“সেখান থেকে আমি ভাটারার গ্রামে ফিরি। আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা -- অপারেশন মোনায়েম খান।”...

“আমি মোনায়েম খানের গোয়ালা জব্বার চাচাকে খুঁজে বের করে তাকে সব কিছু বলি। তিনি আমাকে বলেন, তুই তার রাখাল শাজাহানের সঙ্গে খাতির কর। তোর কাজ হবে। খবরদার, আমার কথা কিছু বলবি না!”

“জব্বার চাচা একদিন দূর থেকে শাজাহানকে চিনিয়ে দেন। সে তখন বনানীতে মোনায়েম খানের বাসার পাশে গরু চড়াচ্ছে। আমি তার সাঙ্গে এটা - সেটা গল্প জুড়ি। মোনায়েম খানের ওপর রাখালের খুব রাগ।”

“কথায় কথায় শাজাহান বলে, মোনায়েম খান একটা জানোয়ার! আমাকে বেতন তো দেয়ই না, উল্টো নানান নির্যাতন করে। একেকটা সিন্ধী গাই ২০ - ২৫ সের দুধ দেয়। এক ফোঁটা দুধও আমাকে খেতে দেয় না। গাই দোয়ানোর সময় মোড়া পেতে সে নিজেই বসে থাকে, যেনো দুধ চুরি না হয়। পাঁচবার বাসা থেকে পালিয়েছি। প্রত্যেকবার পুলিশ দিয়ে আমাকে ধরিয়ে এনেছে। মুক্তিরা এতো মানুষকে মারে, এই ব্যাটাকে মারতে পারে না!”

“আরেকটু খাতির হওয়ার পর একদিন শাজাহানকে আমি বলি, আমার সঙ্গে মুক্তিদের যোগাযোগ আছে। আপনি যদি সহায়তা করেন, তাহলে আমি তাদের খবর দেই, আপনি মোনায়েম খানকে মারার ব্যবস্থা করুন। শাজাহান রাজী হয়। আরও দু - একদিন ঘোরানোর পর শাজাহান অস্থির হয়ে পড়ে, কই, আপনার মুক্তিরা তো আসে না!”

“একদিন বিকালে আমি একটি চটের ব্যাগে আমার স্টেন গান, দুটি ম্যাগজিন, একটি হ্যান্ড গ্রেনেড আর একটি ফসফরাস বোমা নিয়ে শাজাহান ভাইয়ের কাছে হাজির হই। তাকে বলি, আজ সন্ধ্যায় একটু দেরীতে গরুগুলোকে মোনায়েম খানের বাসায় ঢোকাতে হবে। আর আমাকে লুকিয়ে নিয়ে যেতে হবে বাসার ভেতর। সেই প্রথম শাজাহান ভাই বোঝেন, এতোদিন আমার কাছে মুক্তিবাহিনীর যে গল্প তিনি শুনেছেন, আমিই সেই মুক্তি বাহিনী! তিনি আমার প্রস্তাবে রাজী হন।”

তিন। আমি বলি, “তো অস্ত্র - শস্ত্র নিয়ে মোনায়েম খানের বাসার ভেতর ঢুকলেন? শুরু হলো অপারেশন?”

মোজাম্মেল ভাই বলেন, “ওই দিন বাসার ভেতরে ঢুকতে পারলেও সেদিনই অপারেশন করতে পারিনি। পর পর দুবার ব্যর্থ হই। ... প্রথমবার ওই সন্ধ্যায় মোনায়েম খানের বাসায় ঢুকে গেটের পাশের কলাবাগানের ঝোঁপে ঘাপটি মেরে বসে থাকি। একটু পরে তার রাখাল সেই শাজাহান ভাই এসে খবর দেয়, মোনায়েম খানের শরীর খারাপ। সে দোতলায় উঠে গেছে। দোতলায় যেতে গেলে তার ছেলের ঘরের সামনে দিয়ে যেতে হবে। আবার বাড়ি ভর্তি লোকজন।”

“অপারেশন ওইদিন স্থগিত রেখে আমি সেখান থেকে চলে যাই পাশের বনানী খ্রিস্টান পাড়ায়। সেখানে প্রচুর ইটের পাঁজা ছিল। ইটের পাঁজায় হাতিয়ারের ব্যাগটি লুকিয়ে চলে আসি।”

“পরে আরেকদিন সন্ধ্যায় হাতিয়ারের ব্যাগ নিয়ে শাজাহান ভাইয়ের সঙ্গে আবার মোনায়েম খানের বাসায় যাই। আবার সেই কলাবাগানে ঘাপটি মেরে বসা। কিন্তু তখন একটি উজ্জল বৈদ্যুতিক বাল্বের আলোয় চারপাশের সব কিছু পরিস্কার। আমি অন্ধকারের আড়াল পেতে সেই বাতিটি ইট মেরে ভেঙে ফেলি। এতেই বিপত্তি দেখা দেয়।”

“একজন চাকর ভাঙা বাল্ব দেখে চিৎকার - চেঁচামেচি শুরু করে, বাড়িতে চোর ঢুকেছে! মোনায়েম খানের বাসা পাহারা দিতো যে সব বেলুচিস্তানের অবাঙালি পুলিশ, তারা হুইসেল বাজিয়ে, টর্চ মেরে চোর খোঁজাখুঁজি শুরু করে। আমি বিপদ দেখে আবার পালাই।”

আমি বলি, “ও আচ্ছা। কিন্তু এতোদিন পত্রিকায় কিন্তু এই সব ঝক্কি - ঝামেলার কথা পড়িনি। আমি ভেবেছি”...।

মোজাম্মেল ভাই হাসেন, “আরে পত্রিকা ওয়ালারা এতো কথা লিখতে চায় না। ওরা হচ্ছে, সংক্ষেপে বিস্তারিত!”

“তো তারপর তো আমার মন খুব খারাপ। পর পর দুবার অপারেশনে বাধা। আর বুঝি হবে না! এদিকে শাজাহান ভাই ভাটারা এসে একদিন আমাকে ধরে, কী ভাই, যুদ্ধ হবে না? তার কথায় আবার মনোবল ফিরে পাই।”

“এবার সহযোগি হিসেবে সঙ্গে নেই আনোয়ার ভাইকে (আনোয়র হোসেন, বীর প্রতীক)। আবারো সন্ধ্যার পর মোনায়েম খানের বাসার ভেতরের সেই কলাঝোপে দুজন লুকিয়ে বসে থাকি। একটু পরে শাজাহান ভাই এসে খবর দেয়, আজকে অপারেশন সম্ভব। মোনায়েম খান, তার মেয়ের জামাই (জাহাঙ্গীর মো. আদিল) আর শিক্ষামন্ত্রী (আমজাদ হোসেন) বাসার নীচ তলার ড্রইং রুমে বসে গল্প - গুজব করছেন।”

“আমি জানতে চাই, কে মোনায়েম খান, চিনবো কী ভাবে? শাজাহান ভাই জানান, একটি সোফায় তিনজনই একসঙ্গে বসে আছে। মাঝের জনই মোনায়েম খান, তার মাথায় গোল টুপি রয়েছে।...আমি অপারেশনের পরের পরিস্থিতি আন্দাজ করে গোয়লা জব্বার চাচা আর শাজাহান ভাইকে জামা - কাপড় নিয়ে বাসা থেকে পালাতে বলি।”

“শুনশান নিরবতার মঝে হাতিয়ার বাগিয়ে আমরা দুজন মূল বাড়িটির দিকে এগিয়ে যাই। আমার প্ল্যান হচ্ছে, স্টেন গানের একটি ম্যাগজিন পুরো খরচ করবো মোনায়েম খানের ওপর। বাকি দুজনকে আরেকটি ম্যাগজিন দিয়ে ব্রাশ করবো।...ব্যাকআপ আর্মস হিসেবে হ্যান্ড গ্রেনেড আর ফসফরাস বোমা তো আছেই।”

“আমরা বাড়ির ড্রইং রুমের দরজায় পৌঁছে দেখি দরজাটি খোলা। দরজার দিকে মুখ করে তিনজন একটি সোফায় ঘনিষ্টভাবে বসে মাথা নীচু করে কোনো শলা - পরামর্শ করছে। মাঝখানে গোল টুপি মাথায় মোনায়েম খান। আমি স্টেন দিয়ে ব্রাশ করি। কিন্তু একটি মাত্র সিঙ্গেল ফায়ার বের হয়, গুলিটি মোনায়েম খানের পেটে লাগে। সে ‘ও মা গো’ বলে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ...বাকি দুজন ভয়ে ‘বাবা গো, মা গো, বাঁচাও, বাঁচাও’ চিৎকার শুরু করে।...আমার স্টেন গান দিয়ে আর ফায়ার হয় না। আমি ম্যাগজিন বদলে বাকী ম্যাগজিন দিয়ে ফায়ার করার চেষ্টা করি, তাতেও কাজ হয় না। আনোয়ার ভাই সেফটি পিন খুলে গ্রেনেডটি ছুঁড়ে মারেন। এবারো ভাগ্য খারাপ। গ্রেনেডটিও ছিলো অকেজো, সেটি দেয়ালে বারি খেয়ে ফেরত আসে।”

“এদিকে তার বাড়ির বেলুচিস্তানী পুলিশরা চিৎকার - চেঁচামেচি শুনে একের পর এক ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করতে থাকে। আমরা দেয়াল টপকে পালাই।”

“দৌড়ে গুলশান - বনানী লেকের কাছে পৌঁছে দেখি জব্বার চাচা আর শাজাহান ভাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমি আনোয়ার ভাইকে ওদের সঙ্গে লেক সাঁতরে ওপারে চলে যেতে বলি। স্টেন গান নিয়ে আমার পক্ষে সাঁতার দেওয়া হয় না। ...খুঁজতে খুঁজতে আমি একটি কোষা নৌকা পেয়ে যাই। সেটা নিয়ে আমি গুলশান ২ নম্বর ব্রিজের কাছাকাছি আসি।”

“এদিকে গোলাগুলির শব্দে একের পর এক পাক আর্মির ট্রাক মোনায়েম খানের বাসার দিকে রওনা হয়েছে। দূরে বড় রাস্তা দিয়ে ট্রাকের চলাচল দেখি। ওই ব্রিজটির ওপর আর্মির চেক পোস্ট ছিলো। আমি ধরা পড়ার ঝুঁকি নিয়েই ক্রলিং করে ব্রিজের নীচ দিয়ে একটু একটু করে ভাটারা পৌঁছাই।”

“ভাটারা বাজারে তখন একটি চায়ের দোকানে সহযোগি তিনজন আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। স্টেনগান কাঁেধ সেই প্রথম গ্রামের মানুষ আমাকে দেখে। এর আগে তারা কানাঘুষায় শুনেছিল, আমি ট্রেনিং নিয়েছি। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করেনি। তখন আমাকে দেখে ভয়ে সবাই দৌড়ে পালায়। আমি শীতে কাঁপতে কাঁপতে (তখন অক্টোবর মাস) কোন রকমে আনোয়ার ভাইকে স্টেনগান দিয়ে বলি, আমার খুব শরীর খারাপ লাগছে! এর পর আমি জ্ঞান হারাই।”

“জ্ঞান ফিরে আসে রাতে আমার বাড়িতে। দেখি, বাড়ির লোকজন ছাড়াও জব্বার চাচা, শাজাহান ভাই আর আনোয়ার ভাই আমাকে ঘিরে আছেন।

আনোয়ার ভাই বলেন, এখানে থাকা নিরাপদ নয়। আমরা নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে যাচ্ছি। তুমিও আমাদের সঙ্গে চলো। আমি তাদের বলি রওনা হয়ে যেতে। আমি রাতটুকু এখানেই বিশ্রাম নিয়ে পরদিন রূপগঞ্জে পৌঁছাবো।”

“পরদিন সকালে ঘুমিয়ে আছি, আমার এক চাচা এসে বললেন, রাতে আকাম করে এসে এখনও তুই বাড়িতে! রেডিও খবরে বলছে, মোনায়েম খান মারা গেছে। এখনই তুই পালা।...আমি রূপগঞ্জে পালিয়ে যাই। সেখানে আমাদের গ্র“পের অন্য সহযোদ্ধারা আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।”

চার। এবার আমি একটু অফ ট্র্যাকে যাই। জানতে চাই, “আচ্ছা মোজাম্মেল ভাই, স্বাধীনতার ৩৬ বছরেও তো স্বাধীনতা বিরোধী - যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলো না। এর কারণ কী বলে মনে হয়?”

মোজাম্মেল হক বলেন, “অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো কোনো না কোনো স্বার্থের কারণে জামায়াতসহ স্বাধীনতা বিরোধী -- যুদ্ধাপরাধীদের লালন - পালন করেছে। তারা ক্ষমতার লোভে ঘৃণ্য এই সব চরম অপরাধীদের সঙ্গে আপোষ করেছে।”

“আপনি কী মনে করেন, দল নিরপেক্ষ এই সেনা সমর্থিত তত্ত্ববধায়ক সরকার যে এখন স্বাধীনতা বিরোধী - যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলছে, এই দাযিত্ব তাদেরই নেওয়া উচিৎ?”

“অবশ্যই। সবদেশে সরকার পক্ষই স্বাধীনতা বিরোধী - যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দায়িত্ব নেয়। এই সরকার দুর্নীতি ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে এরই মধ্যে সুনাম কুড়িয়েছেন। এখন তাদের উচিত হবে বক্তৃতাবাজীর বাইরে চরম অপরাধী হিসেবে স্বাধীনতা বিরোধী - যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজটা অন্তত শুরু করা। নইলে আমরা ধরে নেবো, অতীতের সরকারগুলোর মতো দলনিরপেক্ষ এই তত্ত্বাধবায়ক সরকারেরও কোনো কেনো স্বার্থ রয়েছে; তারাও আপোষকামী। এ ক্ষেত্রে অতীতের সরকারগুলোর সাথে তাদের কোনো পার্থক্য থাকবে না।”

তার কাছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সহযোদ্ধাদের কথা জানতে চাই। মোজাম্মেল ভাই বলেন, “১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও মিরপুরে বিহারীদের কাছে প্রচুর অস্ত্র ছিল। তারা তখনও অস্ত্র সমর্পন করেনি। বিহারীদের পরাজিত করতে সে সময় একাধিক যুদ্ধ হয়। আমি নিজেও এরকম কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নেই। মুক্তিযোদ্ধা জহিরুদ্দীন ঢালি ও দিল মোহাম্মাদ ঢালি একটি প্রাইভেট কার নিয়ে মিরপুরে ঢোকার চেষ্টার করলে দুই দিক থেকে বিহারীরা গুলি করে তাদের খুন করে। সহযোদ্ধাদের এমন করুন মৃত্যূর খবরে আমি নিজেই তাদের লাশ নিয়ে আসার জন্য অপারেশন চালাই। দেখি, গুলিতে ঝাঁঝড়া হওয়া গাড়ির ভেতরে তাদের দুজন রক্তাক্ত অবস্থায় মরে পড়ে আছেন। তীব্র আক্রমনের মুখে তাদের লাশ আর নিয়ে আসতে পারিনি। কিন্তু সব সময়েই তাদের কথা মনে পড়ে।”...

“আর মুক্তিযোদ্ধাদের তো কেউ ঠিকভাবে মূল্যায়নই করেনি” বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি, “সারাদেশেই সব মুক্তিযোদ্ধারাই অবহেলিত। আর এখন সবখানেই রাজাকার, আলবদর, আল শামসের জয়জয়াকার। ...যখন পত্রিকায় পড়ি, মুক্তিযোদ্ধা রিকশা চালান, ভিক্ষে করেন, তখন মনে হয়, এই রকম বাংলাদেশ তো আমরা চাইনি। ...একদিকে টাকার পাহাড় গড়ে উঠছে, আরেকদিনে মানুষ অভাবে, অনাহারে, অপুষ্টি আর অশিক্ষায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে।...আমাদের দাবি, খুব সামান্য -- মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারগুলোকে যেনো রাষ্ট্র নূন্যতম সন্মান দেয়। কিন্তু গত ৩৬ বছরে কোনো সরকারই এই কাজ করেনি।”

“মুক্তিযোদ্ধাদের দুরাবস্থা দেখে, এখন মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি, তাহলে কী একাত্তরে আমরা ভুল করেছি? গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জমি - জমা সংক্রান্ত ৫০ টি মিথ্যে মামলায় আমাকে হয়রানী করা হয়। এর মধ্যে ৮ টি মামলায় আমাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে দুমাস জেল খাটতে হয়। অথচ আমি একজন বীর প্রতীক, ইউপি চেয়ারম্যান। তাহলে সারাদেশে অন্য সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের কী অবস্থা, তা তো সহজেই অনুমেয়।”

মোজাম্মেল হক, বীর প্রতীকের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষে আমি যখন ফিরে আসছিলাম, তখন অন্য নানান কথা সঙ্গে তার সেই শেষ কথাটিই বার বার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে, “ তাহলে কী একাত্তরে আমরা ভুল করেছি?”...

অপারেশন জ্যাকপট- মুক্তিযুদ্ধের নৌ কমান্ডোদের দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প

লিখেছেনঃ সৌরভ >> সময়: মঙ্গল, 24/12/2013 - 7:07অপরাহ্ন
(http://www.istishon.com/node/6151)

১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে সারা দেশের কয়েকটি নৌবন্দরে একযোগে হামলা চালিয়েছিলেন বাংলাদেশের নৌ-কমান্ডোরা। অভিযানের নাম ছিল 'অপারেশন জ্যাকপট'। উদ্দেশ্য পূর্ব পাকিস্তানের বন্দরগুলো অচল করে দেওয়া, যাতে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে সমুদ্র ও নদীপথে খাদ্য ও অস্ত্র আসতে না পারে। অন্য অনেকের সঙ্গে এই অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন সাজেদুল হক চুন্নু নামের এক দুঃসাহসী কিশোর। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর অপারেশনে। তার মুখে শোনা একটি দুঃসাহসী অভিজানের গল্প।
১৪ আগস্ট ১৯৭১, রাত ১০টা। অপারেশন জ্যাকপট পরিচালনা করতে ৩৯ জনের একটি কমান্ডো দল লিমপেট মাইন নিয়ে কর্নফুলী নদীর তীরে জড়ো হয়েছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে উপস্থিত কমান্ডোরা যার যার মাইন গামছা দিয়ে পেটের সঙ্গে বেঁধে নদীতে নেমে পড়বেন। এর আগে বিকেলে দুজন কমান্ডো জেলে সেজে মাছ ধরার ভান করে বন্দরে জাহাজের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে এসেছেন। ফিরে এসে তাঁরা অন্যদের ধারণা দিয়েছেন, সেখানে কয়টি জাহাজ আছে এবং সেগুলো বন্দরের কোন জায়গায় অবস্থান করছে।
ওদিকে আজ সকালেই রেডিওতে গোপন সংকেতের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে অপারেশনের নির্দেশ। আগেই বলা হয়েছিল আকাশবাণী কলকাতা 'খ' কেন্দ্র থেকে 'আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি' গানটি বাজানো হলে অপারেশনে নেমে পড়তে হবে। রেডিওতে সেই নির্দেশ পেয়ে আমরা এখানে হাজির হয়েছি।
রাত সাড়ে ১১টায় দলনেতা ওয়াহিদ চৌধুরী কমান্ডোদের তিনটি গ্রুপে ভাগ করলেন। একটি জাহাজে তিনটি করে মাইন লাগাতে হবে। কারণ অনেক জাহাজের ইঞ্জিন থাকে পেছনে, আবার অনেক জাহাজের সামনে। ইঞ্জিন বরাবর মাইন বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলে জাহাজের ক্ষতি বেশি হয়। সে কারণে প্রতিটা জাহাজে তিনটি করে মাইন বিস্ফোরণ করতে তিনজন করে কমান্ডো নিয়োগ দেওয়া হলো। রাত সাড়ে ১২টায় আমরা ৩৯জন কমান্ডো যার যার মাইন নিয়ে তৈরি হয়ে দাঁড়ালাম। দলনেতা সবার উদ্দেশে বললেন, 'শোনো কমান্ডোরা, বন্দরের দিক থেকে কর্ণফুলীর পানিতে মাঝেমধ্যেই সার্চলাইট ফেলে সতর্কতামূলক গুলি করা হয়। কারো শরীরে সেই গুলি লাগলে চিৎকার না করে সঙ্গে সঙ্গে পানিতে ডুবে যাবে। এখনো সময় আছে, কারো ভয় লাগলে অপারেশন থেকে সরে দাঁড়াও।' দলনেতার কথা শুনে আটজন কমান্ডো সরে দাঁড়ালেন।
রাত গভীর হতে হতে ১৫ আগষ্ট চলে এলো। আট কমান্ডোকে রেখে আমরা বন্দর থেকে এক কিলোমিটার উজানে হেঁটে গেলাম। কারণ বন্দরের সোজাসুজি পানিতে নামলে স্রোত আমাদের ভাসিয়ে জাহাজ থেকে দূরে নিয়ে যাবে। নির্দিষ্ট স্থানে পেঁৗছে এক লাইনে তিনজন করে কমান্ডো পানিতে নেমে পড়লাম। আগে থেকেই বলা ছিল, তিনজন হাত ধরাধরি করে স্রোতের সহায়তায় সাঁতরে জাহাজের কাছে যেতে হবে, যাতে একই জাহাজে তিনজন তিনটি মাইন স্থাপন করতে পারেন। পানিতে নামার সময় মায়ের মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, আর হয়তো মায়ের সঙ্গে দেখা হবে না।
নদীর পানি ছিল খুবই ঠাণ্ডা। ৬০ থেকে ৭০ হাত যাওয়ার পরই আমাদের তিন জনের হাত ছুটে গেল। একা হয়ে গেলাম আমি। শব্দ না করে সাঁতরানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল বলে নিরাপদেই এগিয়ে যেতে লাগলাম। আরো কিছুক্ষণ সাঁতরানোর পর পায়ে মাটি ঠেকল, দাঁড়িয়ে গেলাম। উপরে তাকিয়ে জেটি দেখতে পেলাম। সেখান থেকে লোকজনের কথার শব্দ আসছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এদিক ওদিক তাকিয়ে কোনো জাহাজ দেখতে পেলাম না। সামনের দিকে এগোবো কি না ভাবছি, এমন সময় নদীর মধ্যে নোঙর করা একটা বড় বার্জ দেখতে পেলাম। প্রশিক্ষণের সময় আমাদের বলা হয়েছিল, যদি বন্দরের নদীর মধ্যে কোনো জাহাজ ডোবানো যায়, তাহলে বন্দরে জাহাজ চলাচলে অসুবিধে হবে। এমনকি বন্দরের নদীপথ বন্ধও হয়ে যেতে পারে।
দেরি না করে আমি সোজা বার্জের কাছে চলে এলাম। আমি জানতাম, বার্জের ইঞ্জিন পেছনে থাকে। তাই পেছন দিকে লিমপেট মাইনটি লাগালাম। খুব শক্তিশালী বিস্ফোরক। দেখতে অনেকটা মাঝারি সাইজের গোল মিষ্টি কুমড়ার মতো। তবে কিছুটা চ্যাপ্টা। এটি তিন চার ইঞ্চি পুরু স্টিলের পাতে তিন-চার ফুট জুড়ে গর্ত করতে পারে।
আমার মাইনটি স্থাপন করার পরপরই বন্দরের দিকে একটি জাহাজে মাইন বিস্ফোরিত হলো। সঙ্গে সঙ্গে জেটির সার্চলাইট জ্বলে উঠল। সেই সঙ্গে শুরু হলো বৃষ্টির মতো গুলি। অন্ধকারে পানিতে ডুবে থাকার কারণে তারা আমাদের কাউকেই দেখতে পারছিল না বলে এলোমেলো গুলি ছুঁড়ছিল। সেই গুলির হাত থেকে বাঁচতে আমি ডুব দিয়ে বার্জের উল্টোদিকে এসে ভেসে রইলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, আমার লাগানো মাইন বিস্ফোরণের সময় হয়ে এসেছে। দ্রুত সরে না পড়লে মাইন বিস্ফোরণে আমিও মারা যাব। অগত্যা ডুব দিয়ে দিয়ে তীরের দিকে সরে যেতে লাগলাম। যখনই মাথা পানির উপরে তুলি, দেখি বৃষ্টির মতো গুলি যাচ্ছে। পেছনে বার্জ থাকায় আমার সুবিধে হলো। আমি সেটাকে আড়াল করে তীরের দিকে এগোতে লাগলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যে তীরে চলে এলাম। তারপর শুয়ে পড়লাম কাদার মধ্যে। দুইবার সার্চ লাইটের আলো আমার ওপর দিয়ে চলে গেল। কিন্তু শীরের কাদা লেগে থাকায় ওরা আমাকে দেখতে পেল না। ওদিকে একটার পর একটা মাইন বিস্ফোরণের শব্দ আসছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে জেটি থেকে গুলির পরিমাণ। ক্রলিং করে আমি যতটা সম্ভব এগিয়ে গেলাম। তারপর আবার শুয়ে বিশ্রাম নিলাম। বসতে সাহস হচ্ছে না। মাথার ওপর দিয়ে শাঁ শাঁ করে গুলি ছুটছে। আরো কিছুক্ষণ ক্রলিং করার পর একটা ছনের ঝাড়ের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। অপারেশনের পর যেখানে মেলার কথা, আস্তে আস্তে সেদিকে এগোতে লাগলাম। ছনের ধারাল পাতায় আমার মুখ ও বুকের অনেক জায়গায় কেটে গেল। রক্ত ঝরতে লাগল। ব্যথাও করছিল বেশ, কিন্তু জাহাজ ডোবানোর আনন্দে সেই ব্যথার কথা ভুলে গেলাম।
মিনিট দশেক পর নির্দিষ্ট জায়গায় পেঁৗছালাম। সেখানে এসে দেখি আমাদের গাইড এবং যারা শেষ মুহূর্তে অপারেশনে যায়নি, তারা মাটিতে শুয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের দলনেতাসহ আরো সাত আটজন কমান্ডো ফিরে এলো। শুয়ে শুয়েই আমরা ঠিক করলাম, এখানে আর থাকা যাবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই পাকিস্তানি সেনারা মর্টার শেল নিক্ষেপ শুরু করবে। শেলের হাত থেকে বাঁচতে হলে আরো দূরে গ্রামের দিকে সরে পড়তে হবে। তখনো আমাদের হাতে অব্যবহৃত কয়েকটি মাইন ছিল। সেগুলোকে নালার মধ্যে ফেলে দিলাম। তারপর সবাই হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে দিয়ে সরে পড়তে লাগলাম। মাইল দুয়েক যাওয়ার পর পা সোজা করে চলার সাহস হলো। আরো ঘণ্টা দেড়েক দৌড়ানোর পর একটা গ্রামে এসে উপস্থিত হলাম আমরা। গ্রামটা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে। এবার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। অপারেশন জ্যাকপট সফলভাবে সমাপ্ত করতে পেরেছি বলে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিলাম। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাকিস্তানিদের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিরোধের পরও অভিযানে অংশ নেওয়া সবাই অক্ষত অবস্থায় ফিরে এসেছিলাম।
তোমরা শুনে অবাক হবে, আমরা যখন চট্টগ্রাম বন্দরে হামলা করছি, ঠিক একই সময়ে মংলা, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, চাঁদপুরসহ আরো বেশ কয়েকটি জায়গায় নৌ-কমান্ডোরা একই ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করে। ফলে দেশব্যাপী অসংখ্য জাহাজ ডুবে যায়। ডুবে যাওয়া জাহাজগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি বিদেশি জাহাজ ছিল বলে অপারেশন জ্যাকপট সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।
পুর্বের কথাঃ
মার্চের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সাবমেরিন পি এন এস ম্যাংরো ফ্রান্সের তুলন সাবমেরিন ডকইয়ার্ডে যায় পাকিস্তানি সাবমেরিনারদের প্রশিক্ষন দেয়ার জন্য। সেই ৪১ জন সাবমেরিনারদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি অফিসার। তারা আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে ২৫ মার্চের গণহত্যার কথা শুনে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে ৮ জন ৩০ মার্চ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ৯ এপ্রিল ১৯৭১ তারা দিল্লিতে এসে পৌছান। এখানে তাদের নাম উল্লেখ করা হলোঃ
১। মোঃ রহমতউল্লাহ।
২। মোঃ সৈয়দ মোশাররফ হোসেন।
৩। মোঃ শেখ আমানউল্লাহ।
৪। মোঃ আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।
৫। মোঃ আহসানউল্লাহ।
৬। মোঃ আবদুর রকিব মিয়া।
৭। মো আবদুর রহমান আবেদ।
৮। মোঃ বদিউল আলম।
তারপর উক্ত ৮জনের সাথে আরো কয়েকজনকে একত্র করে ২০ জনের একটি গেরিলা দল গঠন করে তাদের ভারতে বিশেষ ট্রেনিং দেয়া হয়। তারপর তারা দেশে আসলে তাদের সাথে কর্নেল ওসমানীর দেখা করানো হয়। তখন ওসমানী নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠনের সিদ্ধান্ত নেন।
ওসমানীর সিদ্ধান্তে নৌ-কমান্ডো সেক্টর খোলার পর বাছাইকৃত গেরিলাদের ট্রেনিং দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে ২৩ মে ১৯৭১ তারিখে একটি গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়। এই ট্রেনিং ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেয়া হয় সি-২ পি (C-2 P)। এখানে ট্রেনিং দেয়ার উদ্দেশ্যে অন্যান্য সেক্টরসমূহের বিভিন্ন শিবির থেকে মে মাসের শুরুর দিকে প্রায় ৩০০ জন বাছাইকৃত যোদ্ধা সংগ্রহ করা হয়। ট্রেনিং ক্যাম্পে এদের কি ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে সে বিষয়টি এতই গোপনীয় ছিল যে, সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যেও শুধুমাত্র যার এলাকায় অপারেশন চালানো হবে তিনি ব্যাতিত আর কেউ এই সম্পর্কে জানতেন না
ট্রেনিং শুরু হবার আগেই বাছাইকৃত যোদ্ধাদের বলে দেয়া হয় যে এটি একটি সুইসাইডাল অপারেশন বা আত্মঘাতী যুদ্ধ হবে। তাই অপারেশনের সময় যেকোন মূল্যে অপারেশন সফল করারা উদ্দেশ্যে প্রয়োজনে তাদের প্রাণ দিতে হতে পারে। তাই প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীদের ছবি সহ একটি সম্মতিসূচক ফর্মে স্বাক্ষর নেয়া হতো।ফর্মে লেখা থাকতো যে, আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।
নৌ-কমান্ডোদের ঐ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নেভাল অফিসার কমানডার এম,এন,সামানত,এম,ভি,সি ও ট্রেনিং দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন লেঃ কমান্ডার জি এম মার্টিস,ভি,আর,সি ও এন,এম এবং আরও ভারতীয় ২০ জন প্রশিক্ষক তারা হলেনন লেঃ দাস,ভি,এস,এম,লেঃভি,পি,কফিল,ভি,আর,সি,। প্রশিক্ষকদের মধ্যে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন সাব-মেরিনার ছাড়াও আরো ছিলেন ভারতীয় নৌ-বাহিনীর,লিডিং সি,মান কে,সিং,এম,ভি,সি,লিডিং সি,মান মিঃ গুপ্ত,এন,এম, এল সিং,এন,এম, মারাঠি নানা বুজ এবং সমীর কুমার দাশসহ আরো কয়েকজন।
ট্রেনিং এর দুটো অংশ ছিল। সবাইকে প্রয়োজনীয় স্থলযুদ্ধ যেমনঃ- গ্রেনেড নিক্ষেপ, এক্সপ্লোসিভের ব্যবহার, স্টেনগান রিভলবার চালানো, আন-আর্মড কমব্যাট(খালি হাতে যুদ্ধ) ইত্যাদি শিখতে হতো। আর জলযুদ্ধের ট্রেনিঙের মধ্যে ছিল বিভিন্ন ধরনের সাতার যেমনঃ- বুকে ৫-৬কেজি ওজনের পাথর বেধে সাতার, চিৎ সাতার, কোন মতে পানির উপরে নাক ভাসিয়ে একটানা অনেক্ষন সাতার, পানিতে সাতরিয়ে এবং ডুব সাতার দিয়ে লিমপেট মাইন ব্যবহার, স্রোতের প্রতিকূলে সাতার, জাহাজের কেবল ভাঙা ইত্যাদি কঠিন সব প্রশিক্ষণ দেয়া হত তীব্র খরস্রোতা ভাগীরথী নদীতে। শীত-বর্ষায় একটানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার অভ্যাস করতে হয় সব যোদ্ধাকে। প্রায় টানা তিন'মাস ট্রেনিং (যেখানে কোন সশস্র বাহিনীতে এই ট্রাইনিং নিতে গেলে প্রায় দুই বছর সময় লাগত) এর পর আগস্টের প্রথম সাপ্তাহে তাদের ট্রেনিং শেষ হয়।
যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের শেষদিকে এসে আক্রমণের পরিকল্পনা সাজানো হতে থাকে। একই সাথে একই সময়ে দুই সমুদ্র বন্দর ও দুই নদী বন্দরে আক্রমণ চালানোর জন্য চার সেক্টরের পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটানো হয়। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রথম ব্যাচকে চার স্থানে আক্রমণের উদ্দেশ্যে মোট চারটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। ৬০ জনের ২টি দল এবং ২০ জনের আরো ২টি দল। চারটি দলের চারজন লিডার ঠিক করে দেয়া হয়েছিল। টিম লিডারদের অপারেশন পরিচালনার জন্য শিখিয়ে দেয়া হয়েছিল বিশেষ গোপনীয় পদ্ধতি যা টিমের অন্যান্য সদস্যদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল[। টিম কমান্ডারদের বলা হয়েছিল যে, দুটি বাংলা গানকে সতর্ক সঙ্কেত হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গান দুটি প্রচার করা হবে কলকাতা আকাশবানীর পক্ষ থেকে পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানে সকাল ৬টা থেকে ৬:৩০ মিনিট অথবা রাত ১০:৩০ মিনিট থেকে রাত ১১টায়। এই ফ্রিকোয়েন্সির নাম ও গান দুইটি শুধু টিমের কমান্ডারই জানতো। গানদুটি অথবা তাদের সঙ্কেত হলোঃ- ১ '। আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শশুর বাড়ি, আল্পনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাওয়া শিশু সংগীত। এটি হবে প্রথম সঙ্কেত, এর অর্থ হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২য় গান প্রচার হবে। এর মধ্যে আক্রমণের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। '২.'আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান, বদলে চাইনি প্রতিদান পংকজ মল্লিকের গাওয়া রবীন্দ্র সংগীত। এটি ২য় এবং চূড়ান্ত সঙ্কেত, অর্থাৎ সুস্পষ্ট নির্দেশ যে ঐ রাতে যে ভাবেই হোক আক্রমণ করতেই হবে।

বাংলালিংকের অপারেশন জ্যাকপট নিয়ে জাগরণী সিরিজের প্রতিকি অ্যাড
https://www.youtube.com/watch?v=6tw-8WeueNM


সামনে লিমপেট ও অন্যান্য সরঞ্জামদি নিয়ে যোদ্ধারা।



প্রায় ৬ কেজি ওজনের লিমপেট পেটে বাঁধা



১৯৭১ এর ৫ই অক্টোবর জাতিসঙ্ঘে ভাষণদানকালে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের নেতা মাহমুদ আলী ও ১২ই অক্টোবর পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বাঙলায় তাদের পরিবহণ বিপর্যস্ততা ও জাহাজ ধ্বংসের সুতীব্র পরাজয় ও ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করতে বাধ্য হন, যা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সুবিশাল বিজয়।



মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডোদের আক্রমনের পুর্ব মুহুর্তের একটি দৃশ্যের ছবি। প্রত্যেকের বুকে মাইন বাঁধা। ছবিটি চাদপুর এলাকায় তোলা।




১৫ আগস্ট ১৯৭১। আরও ৫ টি জাহাজের সঙ্গে নৌ কমান্ডোরা মংলা বন্দরে মার্কিন জাহাজ S S lightning ডুবিয়ে দেয়।


তথ্যসুত্রঃ
১।গুগোল,
২।ইউটিউব,
৩।লক্ষ প্রানের বিনিময়ে-রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম,
৪মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডো-মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি। 

Tuesday, December 9, 2014

মুক্তিযোদ্ধা- তখন এখন

(তথ্যসূত্র- সিডাটিভ হিপনোটিক্স, লাইটার ফেসবুক পোস্টস)   

মুক্তিযোদ্ধা মোঃ সফর আলী
কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের মনসুর গ্রামের বাসিন্দা। একাত্তরে কোরমা বাগানে ৩৬টি হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে টানা সাতদিন ব্লক করে রেখেছিলেন পাকিস্তানী সৈন্যদের। স্বাধীন দেশে ফিরে দেখলেন, নিঃস্ব এক মানুষ তিনি। ঘোর নেই, বাড়ি নেই, কিচ্ছু নেই। তবে সেই দেশটা আছে। কিন্তু সেই দেশে নিজেকে আর কোথাও খুঁজে পান না সফর আলী। আমরা খুঁজে পেলাম। দীর্ঘদিন রিকশা চালিয়ে বেঁচে থাকা সেই মানুষটা স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এসে সুদীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। তার কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে স্বদেশের বাতাস। হাতের ইনফেকশনে মৃতপ্রায় এক পরাজিত সৈনিক! কিন্তু পরাজয় এতো সহজ!! সেই রুদ্র প্রাণের মুক্তিযোদ্ধার?

মুক্তিযোদ্ধা অজিত রঞ্জন আচার্য্য
কুলাউড়া উপজেলার মনরাজ গ্রামের বাসিন্দা। যুদ্ধ যখন শুরু হয়, তখন তিনি ক্লাস সিক্সের ছাত্র। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চলে গিয়েছিলেন ভারতের কৈলাশশহরের রিফিউজি ক্যাম্পে। সেখানে প্রায় তিন মাস থাকার পর আর মন টিকছিল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার যুদ্ধ চলছে, আর তিনি কী করে পালিয়ে থাকবেন! চলে গেলেন লোহারবনের ট্রেনিং ক্যাম্পে। প্রায় দুই মাস ট্রেনিং নেয়ার পর তাঁদের গ্রুপকে লাঠিটিলায় গেরিলা হামলার জন্য পাঠানো হলো। রাতের আঁধারে হামলা চালিয়ে আবার রাতের মধ্যেই ভারতের ট্রেনিং ক্যাম্পে ফিরে যেতেন। এভাবেই করলেন যুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবারও সেই নিঃস্ব মানুষের গল্প! সেই গল্পের সবটা জুড়ে তীব্র উপহাস! স্বাধীনতার ৪৩ বছরে এসে ঘর নেই তার! অথচ কি নির্লজ্জ স্পর্ধায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি এই মাটিতে! কি ভয়াবহ নির্লজ্জ স্পর্ধায়!!
তাঁর শেষ ইচ্ছা হলো মারা যাওয়ার আগে পরিবারের জন্য একটা টিনশেডের ঘর বানিয়ে দিয়ে যাওয়া। সারাজীবন দারিদ্র্যতার সঙ্গে লড়ে আসার পর একজন মুক্তিযোদ্ধার কতো সামান্য এক চাওয়া, 'আমার পরবর্তী প্রজন্ম যেন একটু ভালো বাসাতে থাকে!'

মুক্তিযোদ্ধা নিমাই রায়
পেশায় চা শ্রমিক। এখনো, তখনো! ১৯৭১ সালে ষোল বছর বয়সে যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিতে চলে গিয়েছিলেন যুদ্ধে। যুদ্ধ করেছিলেন চার নং সেক্টরের কাশিনগর, লোহাউনি বাগান ও শমশেরনগরে। বয়স এখন ষাট। অনেক স্মৃতিই ভুলে গেছেন। অথবা ভুলেন নি! আদতে কথা বলতেই ইচ্ছুক নন এই মানুষটা। তেতাল্লিশ বছর কেটেছে অনাদরে-অবহেলায়, শুনেছেন অসংখ্য আশ্বাসবাণী। কিন্তু সেগুলো শুধু ফাঁকা বুলিই থেকে গেছে! তাই রাগে-ক্ষোভে যুদ্ধের সময়ের কথাই স্মৃতিচারণ করতে চান না। তাঁর একটাই কথা, 'চা শ্রমিক ছিলাম। যুদ্ধের ডাক এসেছে, তাই দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধে গেছি। দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর আবার চা বাগানে কাজে যোগ দিয়েছি।' সাদাসিধে মানুষটার মনে কতটা কষ্টের বোবা আর্তনাদ, কতটা বিতৃষ্ণা তাঁর এই জীবনের প্রতি

মুক্তিযোদ্ধা দীপক চক্রবর্তী
কুলাউড়া উপজেলার লোহাউনি বাগানের বাসিন্দা। ১৯৭১ সালে ১৬ বছরের টগবগে তরুন, ক্লাস নাইনে পড়ছেন। একটা স্বাধীন দেশ, একটা পতাকার জন্য নিজ দায়িত্ববোধ থেকেই যুদ্ধে যোগদান করেন। বয়স কম থাকায় প্রথমে নিতে চাননি কমান্ডার। কিন্তু কমান্ডারের পায়ে ধরে সে কী অনেক কাকুতি মিনতি! পরে কমান্ডার বাধ্য হলেন তাঁকে সঙ্গে নিতে। প্রায় চার মাস ট্রেনিং দেয়ার পর পাগল হয়ে উঠলে, 'আমি যুদ্ধে যাব, যুদ্ধে!' এরপর যুদ্ধে গেলেন, দুঃসাহসী সব মিশনে অংশ নিলেন, হানাদারদের বিতাড়িত করতে গিয়ে গুলিও খেয়েছেন। তবু আজ তাঁকে চা বাগানে কাজ করতে হয়। রাত গভীর হলে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর দুশ্চিন্তায়, 'আমার কিছু হলে মেয়ের কি হবে, স্ত্রীর কি হবে!

মুক্তিযোদ্ধা শ্রী হরেন্দ্র দাস
১৯৭১ সাল, ১৯ বছরের হরেন্দ্র তখন যুদ্ধে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। ভারতের লোহারবনে ট্রেনিং নিয়ে প্রথমে কুকিরতলে, তারপর জুরিতে যুদ্ধ করেন। ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ঝটিকা হামলা চালিয়ে আবার ট্রেনিং ক্যাম্পে ফিরে যেতেন। এরকম কতবার যে গুপ্ত হামলা চালিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। দেশের ইজ্জত রক্ষার্থে যদি মারা যেতেন তাতেও তাঁর কোন আফসোস ছিলো না। তাঁর খারাপ লাগে শুধু একটি কারণে, স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও কোন মুল্যায়ন পাননি। নিজে এখনো ঠেলা চালান, কারো বাড়ীতে গিয়ে কাজ করেন। এভাবেই চালাচ্ছেন নিজের পরিবার। সদা হাসি লেগে থাকে তাঁর মুখে। তাঁর সঙ্গে কথা না বলে শুধু দেখে ঠাউর করা কঠিন, কত না কষ্ট তাঁর বুকে জমাট বাধা! একটাই চাওয়া, তাঁকে একটি ঘর করে দেওয়া হোক। এখনো হাত-পা আছে, কিছু না কিছু করে খেতে পারবেন। কিন্তু আমৃত্যু চেষ্টা করলেও একটা টিনের বাড়ি যে করা হবে না তাঁর!


Friday, December 5, 2014

অনুবাদঃ লেটার টু আ পাকিস্তানি ডিপ্লোম্যাট

"Mashroof Hossain"-র নোটস থেকে নেয়া (https://www.facebook.com/notes/1509810799295886/)  

কোন এক পাকিস্তানি কূটনীতিকের উদ্দেশ্যে চিঠিঃ(নিউ ইয়র্ক রিভিউ অফ বুকস,২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১)
(আজ থেকে ৬ বছর আগে লেখাটি অনুবাদ করেছিলাম, সেই ২০০৮ সালে-বিজয়ের মাসে আবার তুলে দিচ্ছি।লেখাটির কিছু কিছু বিষয়ের সাথে একেবারেই একমত নই, বিশেষ করে বংগবন্ধুকে নিয়ে তাঁর মন্তব্য রীতিমত আপত্তিকর।অবশ্য পাকিস্তানি কারো মুখ থেকে বংগবন্ধুর  প্রশংসা আশা করাটাও বাতুলতা, কাজেই এ প্রসংগে না যাই। মূল লেখার লিংক নীচে দেয়া আছে।)
ইকবাল আহমেদ
নিউইয়র্ক টাইমসে(১০ এপ্রিল ১৯৭১) আরো তিনজন পশ্চিম পাকিস্তানি পন্ডিতের সাথে স্বাক্ষরিত আমার একটি চিঠি প্রকাশিত হয়। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সামরিক সরকারের হস্তক্ষেপের বিরোধীতা করে আমার প্রদত্ত বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এরপর বহু পাকিস্তানি কর্মকর্তা প্রতিবাদ জানিয়েছেন।তাঁরা সবাই নির্দিষ্টভাবে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো তুলে ধরেছেনঃ

১)জেনারেল ইয়াহিয়ার নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী কেবলমাত্র একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দমনের মাধ্যমে জাতীয় সংহতি বজায় রাখতে চাইছে-যে আন্দোলন সফল হলে ৭ কোটি পূর্ব পাকিস্তানি মানুষ সাড়ে ৫ কোটি পশ্চিম পাকিস্তানির কাছ থেকে পৃথক হয়ে যাবে।
২)বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদীরা(*) পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত পশ্চিম পাকিস্তানি নাগরিক এবং বিহারী সংখ্যালঘু উদ্বাস্তুদের হত্যা করতে শুরু করার পরই সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করেছে।
৩)যেহেতু আওয়ামি লিগের নেতারা পশ্চিমা মনোভাবসম্পন্ন,এবং যেহেতু চীন কেন্দ্রীয় সরকারকে সমর্থন করে-সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এবং আমূল সংস্কারে বিশ্বাসীদের উচিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রমকে সমর্থন করা।
আমার নিম্নলিখিত বক্তব্য উপরোক্ত মনোভাব পোষণকারী এমনই একজন “বন্ধুর” প্রতিঃ
জনাব,
আমি আশা করি আপনি এটা বুঝতে পেরেছেন যে নিউ ইয়র্ক টাইমসে(১০ এপ্রিল ১৯৭১) আপনি যে বক্তব্যটি দেখেছেন সেটা আমি এবং আমার ভাই সাগীর আহমেদের পক্ষে প্রকাশ করাটা খুব একটা সহজ ছিলনা।প্রথমত, বাংলাদেশ আন্দোলনের প্রতি আমার কোন জন্মগত সমবেদনা নেই।বরং শেখ মুজিবের(পূর্ব পাকিস্তানি নেতা,যার দল আওয়ামী লিগ জাতীয় অধিবেশনে সরকার গঠন করার মত সংখ্যাধিক্য লাভ করেছে এবং শতকরা ৯৮ ভাগ বাঙ্গালি ভোট পেয়েছে) প্রতি আমার যথাযথ কারণে বিতৃষ্ণা রয়েছে। তিনি একজন ক্ষুদ্র এবং বোধবুদ্ধিহীন মানুষ হিসেবে আমাকে “মুগ্ধ” করেছেন।কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমি তাঁর পশ্চিম পাকিস্তানি জ্ঞাতি ভাই-গিরগিটির মত নিজের রং বদলকারী দুর্বিষহ জনাব ভুট্টোর প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করি।এছাড়া ঔপনিবেশিক ব্রিটেনে বেড়ে ওঠা আর আমেরিকার অস্ত্রে সজ্জিত জেনারেলরা,যারা দেশকে স্পেন বা গ্রীসের মুসলিম সংস্করণে পরিণত করতে চায়-তাদের প্রতিও আমার মনোভাব খুব একটা উঁচু নয়।
দ্বিতীয়ত, আপনি জানেন যে আমি মূলতঃ বিহারের লোক। আমার পরিবার পরিজনের বেশিরভাগ লোক বিহার থেকে এসে পূর্ব পাকিস্তানে অভিবাসী হয়েছে-যাদের অনেকেই সেনা হস্তক্ষেপের ঠিক আগে উন্মত্ত বাঙ্গালিদের হাতে মারা গিয়েছে।এছাড়া আমি নিজেই পাকিস্তান আন্দোলনের সময় বেড়ে উঠেছি-জাতীয় ঐক্যের কথা চিন্তা না করাটা তাই আমার পক্ষে খুবই কষ্টসাধ্য।সবশেষে,একজন সংস্কারবাদী ও আন্তর্জাতিক মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তি হিসেবে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে আমি অগ্রযাত্রার পথে সঠিক পদক্ষেপ বলে মনে করিনা।এসব কারণে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা হয় এমন একটি নীতিকে সমর্থন করাটাই আমার পক্ষে স্বাভাবিক।
যাই হোক, আমি যখন সমসাময়িক ঘটনাবলী সম্পর্কিত প্রকৃত তথ্যাবলীর দিকে তাকাই-সামরিক হস্তক্ষেপের সপক্ষে রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক বা নীতিগত-কোন ধরণের সমর্থনই খুঁজে পাইনা।বর্তমানে ঘটতে থাকা ঘটনাবলীর প্রতি আমি যতটা তীক্ষ্ণভাবে সম্ভব ঠিক ততটাই তীক্ষ্ণভাবে নজর রাখছি-যদিও অধিকাংশ সংবাদপত্রের রিপোর্টে অসংলগ্নতা রয়েছে।প্রকাশিত সংবাদের উপর সামরিক নিয়ন্ত্রণই এর কারণ,যার কিছুটা ভারত থেকেও এসেছে।

আমার বক্তব্য হচ্ছেঃ
১) সেই ১৯৫৭ সাল থেকে সামরিক শাসনের অধীনে থাকা পূর্ব পাকিস্তানিদের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি ক্ষোভের পুরোপুরি যৌক্তিক কারণ রয়েছে।পশ্চিম পাকিস্তানের সবচেয়ে গোঁড়া সমর্থকও বাঙ্গালিদের প্রতি মোটা দাগের অর্থনৈতিক বৈষম্য আর শোষণের কথা অস্বীকার করতে পারবেনা।১২ বছরের সামরিক শাসন তাদেরকে ক্ষমতার সামান্যতম অংশ থেকেও বঞ্চিত করেছে।

২)প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের জন্যে আওয়ামী লিগের দাবীর প্রতি প্রায় সর্বসম্মত ভোটার সমর্থন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি উন্নাসিকতার ফলাফল ছাড়া আর কিছুই নয়-যে উন্নাসিকতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় সাইক্লোন আক্রান্ত পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি সীমাহীন ঔদাসীন্যে। আমি স্বীকার করি যে পশ্চিম পাকিস্তানের গরীবেরাও ভুক্তভোগী এবং আমাদের নেতাদের ঔদাসীন্য হয়তো দুক্ষেত্রেই সমান।তারপরেও,অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ পূর্ব পাকিস্তানিরা যদি একে প্রাদেশিক বৈষম্যের ফলাফল হিসেবে দেখে তাহলে তাদেরকে দোষ দেয়া যায়না।

৩)সংসদ বহির্ভূত মীমাংসায় পৌঁছতে ব্যর্থ হবার পর পশ্চিম পাকিস্তানি নেতাদের মদদপুষ্ট সেনাবাহিনী ২৫ মার্চ,১৯৭১ পাকিস্তানের সর্বপ্রথম মুক্তভাবে সংঘটিত নির্বাচনের ফলাফল মুছে ফেলতে হস্তক্ষেপ করে। সম্ভবত তারা পাকিস্তানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে আত্মসমর্পনের আশা ছেড়ে দিয়েছিল।এটা এখন দিবালোকের মত সত্য যে ভুট্টো আর মুজিবের দর-কষাকষিকে তারা আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

৪)সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে কেন্দ্রীয় সরকারের জনপ্রিয়তার কোন ভিত্তি নেই।এমনকী চার মাসের আতঙ্কের পরেও তারা সামরিক হস্তক্ষেপকে কিছুটা বৈধতা দিতে পারে এমন একটি দালাল শ্রেণী গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।

৫)পূর্ব পাকিস্তানে যদি সেনাবাহিনীর প্রভূত্ব বজায় থাকে-তাহলে এই ঔপনিবেশিকতার জন্যে পূর্ব আর পশ্চিম দুই পাকিস্তানকেই চড়া মাশুল গুনতে হবে।শেষোক্তটির জন্যে তা বয়ে আনবে অর্থনৈতিক দুর্দশা, সমাজ ও রাজনীতির সামরিকীকরণ এবং নাগরিক অধিকারের পুরোপুরি বরখেলাপ। আসাদ এবং লায়াল-ও-নাহারের মত পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া,পশ্চিম পাকিস্তানের সাম্প্রতিক প্রায় ৮০০ লোকের বিচারবিহীন আটক(যাদের মধ্যে আফজাল বানগাশ,মুখতার রানা আর জি এম সায়েদের মত নেতা, আব্দুল্লাহ মালিক ও শেখ আজিজের মত মননশীল ব্যক্তি এবং জি এম শাহের মত পেশাজীবী পণ্ডিত রয়েছেন) এবং লয়ালপুর আর শিয়ালকোটে সরকারের সাথে ভিন্নমতাবলম্বী জনতার প্রতি পিটুনি একদলীয় মতবাদের দিকে ঝুঁকে যাওয়াকেই নির্দেশ করে।

একইভাবে যেসব সম্পাদকীয় ও বক্তব্য ভারতীয়-ইহুদি-আমেরিকান ষড়যন্ত্রের কথা বলে জনমনে ভীতি ছড়াচ্ছে তা নিয়েও আমি শঙ্কিত।আমেরিকান সরকার অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থ দিয়ে রক্তপিপাসু সামরিক একনায়কত্বকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে- আমার শঙ্কাটি এ কথা জানা সত্বেও বিদ্যমান । সর্বোপরি, সেনাবাহিনী কর্তৃক আমাদের হিন্দু নাগরিকদের পরিকল্পিত হত্যা ও অত্যাচার এবং ধর্মীয় মৌলবাদের উত্থান নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন।এই নীতি ভারতের ৮ কোটি মুসলিমের উপর কি প্রতিক্রিয়া ডেকে আনবে একথা চিন্তা করলে আমি ভয়ে শিউরে উঠি।

৬) এই মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসনের ইতি না ঘটালে দূর্ভিক্ষ,মহামারী এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক পর্যায়ক্রমিক গণহত্যা আগামী মাসগুলোতে লক্ষ লক্ষ প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।সামরিক হস্তক্ষেপ ইতোমধ্যে প্রায় ২৫০,০০০ নিরস্ত্র মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।৬০ লক্ষ উদ্বাস্তু ভারতে পৌঁছেছে।৬০,০০০ থেকে ১০০,০০০ মানুষ প্রতিদিন ভারত যাচ্ছে এবং কলেরা সংক্রমন আর দরিদ্র ভারতীয়দের বিদ্বেষের স্বীকার হচ্ছে।লক্ষ লক্ষ ভীতসন্ত্রস্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষ পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর অমানবিক দিন কাটাচ্ছে-সম্ভাব্য পরিসংখ্যান মতে এটি ইতিহাসের ভয়াবহতম হত্যাযজ্ঞ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আপনি জানেন,পূর্ব পাকিস্তানে অস্তিত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত নাজুক একটি বিষয়।সামান্য অসঙ্গতি এখানে প্রায়ই মর্মান্তিক ঘটনার জন্ম দিয়ে থাকে।১৯৭০ ও ১৯৭১ বিশেষ করে কঠিন সময় হিসেবে দেখা দিয়েছে।গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের বন্যা ছিল বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সবচাইতে ভয়াবহ যা প্রায় ৫ লক্ষ টন খাদ্যশস্য বিনষ্ট করেছে।নভেম্বরের সাইক্লোন,যা কিনা শতাব্দীর সবচাইতে মারাত্মক,সেটিও প্রায় সমপরিমান খাদ্যশস্য বিনষ্ট করেছে এবং একহাজার বর্গমাইল আবাদী জমিকে অন্ততঃ এক বছরের জন্য চাষবাসের অযোগ্য করে দিয়েছে।
এরপর সেনাবাহিনী তাদের বাঙ্গালি প্রতিপক্ষের রসদ সরবরাহে বাধা দিতে মজুদ খাদ্য বাজেয়াপ্ত এবং অগ্নিসংযোগ করেছে।বহু ভীত,বাস্তুচ্যুত কৃষক শীতকালীন ফসল ঘরে তোলেনি।দূর্ভিক্ষ এড়াতে সর্বমোট প্রায় ২৫ লক্ষ টনের এই ক্ষতি যত দ্রুত সম্ভব পুষিয়ে দিতে হবে।বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক জরিপ এবং সেনেটর কেনেডীর প্রকাশিত স্টেট ডিপার্টমেন্টের রিপোর্টে দেখা যায় যে পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চিমা এবং ইউরোপীয় কর্মকর্তারা ওয়াশিংটনকে দূর্ভিক্ষের আশংকায় সতর্ক করেছে।

অন্যেরা তাদের পূর্বাভাসের ব্যাপারে আরো নিশ্চিত তথ্য দিয়েছে।তিন মাস আগে লেইন ম্যাকডোনাল্ড(অক্সফ্যাম ও অন্যান্য সংস্থার রিলিফ সমন্বয়কারী) সতর্ক করে দিয়েছেন যে প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ খাদ্যাভাবের শিকার হতে পারে।সাম্প্রতিক ফিনান্সিয়াল টাইমস অব লন্ডন অনুমান করেছে যে অতি দ্রুত রিলিফ ও পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করা না হলে প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষ মৃত্যুমুখে পতিত হবে।বিবিসির সাংবাদিক এলান হার্ট বিশ্বাস করেন “প্রায় দুই কোটি বা তারও বেশি পূর্ব পাকিস্তানি মানুষ সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবরের মধ্যে খাদ্যাভাবের শিকার হবে”।
দ্রুত রিলিফ সরবরাহের মাধ্যমে আসন্ন মর্মন্তুদ ঘটনা ঠেকিয়ে দেবার সম্ভাবনা খুব কম।শুধুমাত্র বেসামরিক আইনের দ্রুত প্রতিস্থাপন খাদ্যশস্য ও ওষুধপত্রকে সামরিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা ঠেকাতে পারে,এবং এধরণের প্রতিস্থাপনই কেবল রিলিফের সঠিক বিতরণ ও রিলিফকার্যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখা নিশ্চিত করতে পারে।

৭)সবশেষে,আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই যে পূর্ব পাকিস্তানিদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার এমনকী বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া যদি না মেনে নেয়া হয় তাহলে সত্যিকারের বেসামরিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

এ সব কারণে আমি বিশ্বাস করি যে পশ্চিম পাকিস্তানিদের উচিৎ এই মুহূর্তে নিঃশর্তভাবে সামরিক শাসনের বিলোপসাধনে জোর দেয়া,ন্যায়ভাবে নির্বাচিত জাতীয় এসেম্বলিকে সহায়তা করা এবং তার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া-এমনকী সে সিদ্ধান্ত যদি পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে দেয় তবুও।আমাদেরকে অবশ্যই “সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য পাকিস্তানের একমাত্র মুক্তভাবে সংগঠিত নির্বাচনে সদ্য জয়লাভ করা দলের হাত থেকে দেশের অখণ্ডতা রক্ষা করা”-এই উদ্ভট দাবীকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।

সত্যি বলতে কি,পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ কেবলমাত্র স্বায়ত্তশাসনের উপর জোর দিয়েছিলেন।তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দেন সেনাবাহিনী কর্তৃক জাতীয় এসেম্বলী আহবান করতে অস্বীকার এবং ২৫ মার্চ,১৯৭১ রাতে বর্বরভাবে পূর্ব পাকিস্তানে হস্তক্ষেপ করার পরে। ২৮ জুনের ভাষণে জেনারেল ইয়াহিয়া জাতীয় এসেম্বলির সংবিধান রচনার অধিকার অস্বীকার করেন এবং আওয়ামি লিগের সব নেতাদের কর্কশভাবে আক্রমণ করেন।এটি নির্বাচনের ম্যান্ডেট অনুযায়ী যে কোন সমঝোতার সম্ভাবনা ভেস্তে দেয়।

আমি জানি আমাকে আমার অবস্থানের জন্য চড়া মাশুল গুনতে হবে।যে ব্যক্তি আমেরিকায় একটি কঠিন বিচারের মুখোমুখি হচ্ছে(**) তার পক্ষে তার নিজ দেশের সরকারের সাথে সংঘাতে যাওয়া কোন সহজ কাজ নয়।তবুও আমি যখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে আমেরিকান অপরাধ অথবা কাশ্মীরে ভারতীয় দখলদারিত্বের প্রতিবাদ করছি-তখন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের উপর আমার নিজ সরকারের করা অন্যায়গুলো মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।যদিও আমি উন্মত্ত বাঙ্গালিদের হাতে বিহারী হত্যাকান্ড এবং আওয়ামি লিগের দায়িত্বহীনতার নিন্দা করি-কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে আমি সরকার এবং একটি পেশাদার সেনাবাহিনীর অপরাধমূলক কার্যকলাপকে এক করে দেখতে রাজী নই।

নির্ভরযোগ্য রিপোর্টের মতে(যা সরকারীভাবে খণ্ডণ করা হয়নি)দাঙ্গায় বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদীদের হাতে ১০০০০ এর বেশি বিহারী মৃত বা আহত হয়নি।যাহোক,আগস্টের শুরুতে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ একটি শ্বেতপত্র জারি করে যাতে দাবী করা হয় যে এক লক্ষ মানুষ বাঙ্গালিদের হাতে নিহত হয়েছে।এটিসহ শ্বেতপত্রের অন্যান্য অতিরঞ্জিত দাবী নিঃসন্দেহে নিশ্চিতভাবে বিরোধীদলীয় নেতাদের বিচার ও সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ডের অজুহাত হিসেবে তোলা হয়েছে।এ চিঠি লেখার সময় সামরিক সরকার ঘোষণা করেছে যে ১২ আগস্ট শেখ মুজিবকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে “যুদ্ধ শুরু করার” অপরাধে গোপন সামরিক ট্রাইবুনালের মুখোমুখি করা হবে।শ্বেতপত্রে যেহেতু ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে ৭৯ জন জাতীয় এসেম্বলীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে,শেখ মুজিবের বিচার আরো অনেক গোপন বিচারকার্যের পূর্বলক্ষণ হতে পারে।

আমি জানি পূর্ব পাকিস্তানে ৩ সপ্তাহ ধরে চলা অবাঙ্গালি হত্যাকাণ্ড ঠেকানো(যে সময়ে জেনারেলরা রাজনীতিবিদদের সাথে পার্লামেন্ট বহির্ভূত সমঝোতায় পৌঁছানোর ভান করেছেন)সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিলনা।বেসামরিক মানুষদের জীবনরক্ষা করা এই অসহনীয় অত্যাচারের লক্ষ্য ছিলনা-যে অত্যাচারের ফলে অসংখ্য পাকিস্তানি তাদের জীবন ও সহায় সম্পত্তি হারিয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।নৃশংসতার অসম বণ্টন কোন দায়িত্বশীল সরকারের কাজ নয়।এই সেনাবাহিনী যে তাদের কার্যকলাপকে আওয়ামি লিগ আর উন্মত্ত জনতার বাড়াবাড়ি উল্লেখ করার মাধ্যমে বৈধতা দিতে চাচ্ছে-এ থেকেই বোঝা যায় আমাদের সেনাবাহিনী আর বেসামরিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে সভ্যতার মান কতটা নীচে নেমে গিয়েছে।সবচেয়ে বড় কথা, অপরাধ কোন বানিজ্যিক কর্মকাণ্ড নয় যে একজন তার অপরাধ আরেকজনের হিসাবখাতায় গচ্ছিত রাখবে।

এ ব্যাপারে চায়নার ভূমিকা অপ্রাসঙ্গিক বলে আমি মনে করি।তারা পাকিস্তানকে কেবলমাত্র বহিঃশত্রুর আক্রমণের ক্ষেত্রে সহায়তার প্রস্তাব করেছে ; আর এই সংঘাতকে অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসেবে ইঙ্গিত দিয়েছে।কিন্তু আমেরিকার ভূমিকা আসলেই উদ্বেগজনক-তারা তাদের পশ্চিমা বন্ধুদের,কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের এবং বিশ্বব্যাংকের সর্বসম্মত বিরোধিতা সত্ত্বেও একনায়কতন্ত্রের কাছে অস্ত্র বিক্রি এবং অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।পশ্চিম এবং আমেরিকার প্রতি শেখ মুজিব আর তার দলের বিশ্বস্ততার কথা মাথায় রাখলে এ ঘটনা আসলেই লক্ষণীয়।

যেসব পাকিস্তানিরা মনে করে যে স্বৈরাচার এবং সুশীল গণতন্ত্রের মধ্যে বেছে নিতে বলা হলে আমেরিকা শেষোক্তটাকেই বেছে নেবে-পশ্চিম পাকিস্তানি জান্তার প্রতি ওয়াশিংটনের সহায়তা তাদের জন্যে একটি শিক্ষামূলক ঘটনা হওয়া উচিৎ।স্পেন এবং পর্তুগাল থেকে গ্রীস ও ইসরায়েল হয়ে ইরান থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর ও ভারত সাগর অঞ্চলে একটি অনানুষ্ঠানিক কিন্তু নির্ভরযোগ্য সোভিয়েত বিরোধী ব্লক তৈরি করা নিক্সন-কিসিঞ্জারের কর্মকৌশলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ- পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামি লিগের নেতারা এই বিষয়টি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন।
বলা হচ্ছে, জনাব কিসিঞ্জারের চায়না মিশনে সাহায্য করার পুরষ্কার হিসেবে জেনারেল ইয়াহিয়া আমেরিকান সহায়তা পাচ্ছেন।তাই যদি হয়,তবে চীন-আমেরিকান দাঁতাতের শুরুটা হবে এশিয়ার গরীব ও দুর্বলদের জন্যে ক্ষতিকর হিসেবে। আমেরিকান নীতির পেছনে যে কারণই থাকুক না কেন একটি বিষয় নিশ্চিত-এশিয়ার আরেকটি অংশে আমেরিকানরা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের নীরব সহযোগী হয়ে রইল।কিন্তু তাদের দায়ের চেয়ে আপনার আমার দায় অনেক বেশি ভারী।

আমি আরেকটি বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করছি-সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকে মনে হচ্ছে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ বাঁধতে চলেছে।এই দুটি দেশ দিনকে দিন আরো বেশি করে বিশ্ব রাজনীতির খেলায় দাবার ঘুঁটিতে পরিনত হচ্ছে।ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতোমধ্যে বিশ বছর মেয়াদী সম্প্রীতি-চুক্তি হয়েছে যার ফলে ভারত রাশিয়ার কাছে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধে সামরিক সহায়তা লাভ করবে।এ চুক্তির ফলে ১৯৬৬ সালের তাসখন্দ চুক্তিতে পাকিস্তান যে সুবিধা পেয়েছিল(রাশিয়ার কাছ থেকে সহায়তা এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে রাশিয়ার নিরপেক্ষ থাকার আশ্বাস) তা নাকচ হয়ে গেল।
…………………………………………………………………………………………………………………………….

আমি জানিনা আমার অবস্থান আদৌ একটি মানবিক মীমাংসার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা।যেহেতু আমাদের সরকার জনগনের কাছে দায়বদ্ধ কিংবা মানবজাতির মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল-এর কোনটাই নয়,এই অঞ্চল থেকে সব সম্পদ নিঃশেষ হওয়া এবং দেশ নীতিগত,রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া না হওয়া পর্যন্ত আমাদের প্রতিবাদ সম্ভবত কোন প্রভাব রাখতে সক্ষম হবেনা।তবে যাই হোক না কেন- স্বেচ্ছাচারী শক্তির সামনে নিরবতার অপরাধকে আমি সাফল্যের অভাবের কথা বলে বৈধ করতে রাজী নই।
নির্ঘণ্টঃ

(*)এখানে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদী বলতে বর্তমানে একই নামের রাজনৈতিক দল সম্পর্কিত কাউকে বোঝানো হচ্ছেনা সেটি সম্ভবত পাঠকমাত্রই বুঝতে পারছেন।(**)১৯৭১ সালে লেখককে যুদ্ধবিরোধী যাজক ফিলিপ বেরিগান ও তার ভাই ডেনিয়েল এবং আরো ৪ জন শান্তিবাদীর সঙ্গে একসাথে হেনরি কিসিঞ্জারকে অপহরণের মাধ্যমে ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধ করার “ষড়যন্ত্রের” সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ তোলা হয়।এ প্রবন্ধ লেখার সময় লেখক বিচারাধীন ছিলেন।১৯৭২ সালে মামলাটিকে পদ্ধতিগত ভুলের কারণে বিচারকগণ খারিজ করে দেন।

অনুবাদকের কথাঃ

বাবার বুকশেলফ এবং ক্যাডেট কলেজের লাইব্রেরি থেকে কিশোর বয়েসে ১৯৭১ সালের বর্বরতা সম্পর্কে জানার পর থেকেই পাকিস্তানের প্রতি আমার একটা অন্ধ ক্রোধ কাজ করত-যা অনেকটা যুক্তিতর্কের ঊর্ধে। যেহেতু আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি এবং মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে নোংরা কাঁদা ছোঁড়াছুঁড়ির সংস্কৃতির মধ্যেই আমার বেড়ে ওঠা-আমাদের সবচাইতে গৌরবোজ্জ্বল এ অধ্যায় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আছে এটা দাবী করার মত যোগ্যতা আমার নেই।তবে ক্ষুদ্র সামর্থ দিয়ে যতটুকু পারি যেখানে যা পাই তাতে চোখ বুলাতে চেষ্টা করি।আর এরকম চোখ বুলাতে বুলাতেই ইন্টারনেটে চোখে পড়েছিল এই লেখাটি।মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত দিকগুলো যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা,গণহত্যা-নির্যাতন এবং পরবর্তীতে দেশদ্রোহী অপশক্তির আস্ফালন ইত্যাদির ভীড়ে মানবতার একটি দিক কিন্তু আমরা ভুলে যাই-শত্রুপক্ষের ভেতর থেকেও যেসব মানুষ তাঁদের বিবেক আর ন্যায়বোধকে স্বজাতিপ্রেমের ঊর্ধে স্থান দিয়েছিলেন সেসব আলোকিত মানুষদের কথা।এ প্রবন্ধের লেখক ইকবাল আহমেদ একজন স্বনামধন্য পাকিস্তানি চিন্তাবিদ-নোয়াম চমস্কি এবং এডোয়ার্ড সাঈদের মত প্রতিথযশা যুদ্ধবিরোধী বুদ্ধিজীবীদের সাথে তাঁর নামও হরহামেশাই এক কাতারে উচ্চারিত হয়ে থাকে।১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে রচিত এ লেখাটিতে স্বজাতির বর্বরতার বিরুদ্ধে শুধু প্রতিবাদই নয়-বর্তমান সমাজে আমাদের দেশীয় অপশক্তি যেসব যুক্তির মাধ্যমে তাদের অপকর্মকে জায়েজ করার চেষ্টা করে থাকে তার খণ্ডনও রয়েছে।আর এ কারণেই প্রায় চার দশক পরেও এ লেখাটি পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম।আমার আফসোস,বর্বর পাকিস্তানিদের মধ্য থেকে একজন আলোকিত মানুষ আলোচিত বিষয়গুলো এত অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অথচ বাংলাদেশি বহু মানুষের কাছে আজ মুক্তিযুদ্ধ একটা গণ্ডগোল বা ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছুই নয়।আর এই আফসোস থেকেই লেখাটি অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত নেই-যাতে এ যুক্তিগুলো আমাদেরকে বিকৃত ইতিহাসের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করতে পারে।যেহেতু এ লেখাটি অন্য কোথাও অনূদিত হয়েছে কিনা আমার জানা নেই তাই এর কপিরাইট আমি দাবী করছিনা।যদি হয়ে থাকে,সহৃদয় পাঠক তার লিঙ্ক দিলে বাধিত হব।আর আমি যেহেতু পেশাদার অনুবাদক নই-এ অনুবাদ যে মানসম্মত হয়েছে সেটিও আমি আশা করিনা।এ কারণে মূল লেখাটির লিঙ্ক নিচে দিয়ে দিলাম-আগ্রহী পাঠক ইচ্ছে করলেই যাতে ইংরেজিতে লেখা মূল প্রবন্ধটি পড়তে পারেন এবং ইকবাল আহমেদ সম্পর্কে জানতে পারেন সে উদ্দেশ্যে।এছাড়া অনুবাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিলেও তা সহৃদয়চিত্তে গ্রহণ করব।
মুক্তিযুদ্ধ হোক আমাদের সকল বাধা পেরিয়ে যাবার পথে অফুরন্ত প্রেরণার উৎস।